ময়মনসিংহে ছিনতাই যেন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি এখন নগরবাসীর নিত্য আতঙ্ক। সন্ধ্যা নামলেই ব্রিজ মোড়, স্টেশন রোড কিংবা কলেজ রোডে ছড়িয়ে পড়ে অদৃশ্য ভয়। প্রকাশ্যে, চলন্ত অটোরিকশায়, এমনকি জনাকীর্ণ সড়কেও সঙ্ঘবদ্ধ ছিনতাই হচ্ছে। প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না কেউ।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ব্রহ্মপুত্র নদের চরে ঘুরতে গিয়ে ছিনতাইকারীদের ধাওয়ায় নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ হন আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ শাওন (২৬)। দু’দিন পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘেরাও করে তারা খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আলটিমেটাম দেন।
এর আগে, ২৩ অক্টোবর দিঘারকান্দা-রহমতপুর বাইপাস সড়কে বাকপ্রতিবন্ধী অটোরিকশাচালক মাছুমকে ছুরিকাঘাত করে অটোরিকশা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে জেলায় ১১১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে, এর কমপক্ষে ২০টি ছিনতাই সংশ্লিষ্ট।
নগরীর বিভিন্ন সূত্রের দাবি, প্রতি মাসে গড়ে এক হাজারের বেশি ছিনতাই হচ্ছে। কোতোয়ালী থানায় প্রতিদিন গড়ে আট থেকে ১০টি অভিযোগ জমা পড়ে। কিন্তু আইনি জটিলতা, হয়রানির আশঙ্কা ও পুলিশের প্রতি অনাস্থার কারণে অধিকাংশ ভুক্তভোগী থানামুখী হন না।
জেলা পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৬০টি, গ্রেফতার হয়েছেন ৪৬৭ জন। বাস্তব চিত্র যে আরো ভয়াবহ, তা স্বীকার করছেন সংশ্লিষ্টরাও।
মীরবাড়ি এলাকার শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান সজীব জানান, গত চার মাসে তিনি চারবার ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। কলেজ রোড এলাকায় তার মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়া হয়।
টাঙ্গাইল পলিটেকনিকের ছাত্র রুবেল আহমেদ স্বাধীন জানান, চলন্ত অটোরিকশায় যাত্রীবেশে উঠে গলায় ছুরি ধরে তার মোবাইল ও মানিব্যাগ নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
এছাড়া ধোবাউড়া থেকে বেড়াতে এসে জয়নুল আবেদীন পার্কে ছিনতাইয়ের কবলে পড়েন আবু রায়হান। তবে তারা কেউই মামলা করেননি।
জানা গেছে, শম্ভুগঞ্জ, ব্রিজ মোড়, কেওটখালী, সানকিপাড়া, মীরবাড়ি, স্টেশন রোড, পুরোহিতপাড়া, গাঙ্গিনারপাড়, বাইপাস মোড়, জয়নুল আবেদীন পার্কসহ কমপক্ষে ১৫টির বেশি এলাকা এখন ছিনতাইয়ের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত। কেবল অন্ধকার গলি নয়, ভিড়ের মাঝেও অটোরিকশায় সঙ্ঘবদ্ধ ছিনতাই হচ্ছে। জেলার বাইরে থেকে আসা কয়েক লাখ শিক্ষার্থী এখন প্রধান টার্গেট।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গতবছর আটক ৪৬৭ আসামির মধ্যে ৩৬২ জনই স্টেশন রোড, পুরোহিতপাড়া, সানকিপাড়া ও মীরবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। ২০২৫ সালে এসব এলাকার বিরুদ্ধে ৪৫টি মামলা হয়েছে। আটক অনেকেই পেশাদার, জামিনে বেরিয়ে আবারো একই অপরাধে জড়াচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সানকিপাড়ার এক ছিনতাইকারী বলেন, ‘নেশার টাকার জন্যই করি। জেলে যাই, আবার বের হয়ে করি।’ তার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে। মোবাইল নিলে ট্র্যাকিংয়ের ঝুঁকি থাকায় এখন কৌশল বদলেছে বলেও জানান তিনি।
আইনজীবীরা বলছেন, দণ্ডবিধির ৩৮৫, ৩৮৬, ৩৯২ ও ৩৭৯ ধারায় মামলা হলেও দীর্ঘসূত্রতা ও সাক্ষ্য-প্রমাণের জটিলতায় দ্রুত বিচার হয় না।
সচেতন মহলের অভিযোগ, পুলিশের টহল প্রধান সড়কে সীমাবদ্ধ, অলিগলি ও অন্ধকার মোড়গুলো কার্যত অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে। গ্রেফতারকৃতদের প্রায় ৯০ শতাংশ মাদকাসক্ত। মাদকের উৎস বন্ধ না হলে ছিনতাই কমবে না বলেও মত তাদের।
নগরবাসীর দাবি, অপরাধপ্রবণ এলাকায় সিভিল পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি, আইএমইআই ট্র্যাকিং জোরদার, প্রতিটি ওয়ার্ডে কার্যকর বিট পুলিশিং, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সিসিটিভি ও লাইভ মনিটরিং, ছিনতাই পণ্য কেনা-বেচায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ও জামিনে কড়াকড়ি আরোপ করা।
নগরবাসীর প্রশ্ন, প্রশাসনের কঠোর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ কবে দেখা যাবে? নইলে ছিনতাইয়ের এই অদৃশ্য আতঙ্কই হয়ে উঠবে ময়মনসিংহবাসীর দৈনন্দিন নিয়তি।



