সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সালে সিলেট বিভাগে ৩৫৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৬৪ জন নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন ৮৭২ জন। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১৩২ জনই মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারী) সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সিলেট বিভাগীয় কমিটির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এতে দেখা গেছে, দুর্ঘটনায় বিভাগের মধ্যে সিলেট জেলায় সবচেয়ে বেশি হতাহত হয়েছেন। উপজেলার মধ্যে সবেচেয়ে বেশি নিহত হয়েছেন হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায়।
জানা গেছে, গত এক বছরে সিলেট বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের মধ্যে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৩২ জন, সিএনজি লেগুনা চালক ও যাত্রী ৬৬ জন। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি উল্টে ৬২টি দুর্ঘটনায় ৪৭ জন, পথচারী ৮৬ জন, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছের সাথে ধাক্কায় ২৪টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত, মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২০টি দুর্ঘটনায় ১৩০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১২২ জন চালক রয়েছেন।
এছাড়া ২০২৫ সালে বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ২৭৩ জন পুরুষ, ৫৪ জন নারী ও ৩৭ জন শিশু রয়েছেন।
নিসচার প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে সিলেট জেলায় ১৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫৮ জন নিহত ও ২৯৯ জন আহত হয়েছেন। জেলায় দুর্ঘটনার মধ্যে সিলেট-তামাবিল সড়কে ৩১টি দুর্ঘটনায় ২৯ জন, সিলেট-ভোলাগঞ্জ সড়কে ২৭টি দুর্ঘটনায় ২৭ জন, সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কে ২৮টি দুর্ঘটনায় ২৮ জন, সিলেট-এয়ারপোর্ট সড়কে ৭টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত হয়েছেন। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় জৈন্তাপুর উপজেলায় ২২টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন, দক্ষিণ সুরমায় উপজেলায় ২২টি দুর্ঘটনায় ২১ জন ও জকিগঞ্জ উপজেলা ২১টি দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত হয়েছে।
এদিকে সুনামগঞ্জ জেলায় ৬৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৭ জন নিহত ও ১৭০ জন আহত হয়েছেন। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ২১টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত, ছাতক উপজেলায় ১২টি দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত হয়েছেন।
মৌলভীবাজার জেলায় ৫৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬০ জন নিহত ও ৭০ জন আহত হয়েছেন। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় কুলাউড়া উপজেলায় ১২টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত, বড়লেখা উপজেলায় ৭টি দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহত ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ৯টি দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহত হয়েছেন।
হবিগঞ্জ জেলায় ৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৯ জন নিহত ও ৩৩৩ জন আহত হয়েছেন। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় মাধবপুর উপজেলায় ২১টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন, নবীগঞ্জ উপজেলায় ১৮টি দুর্ঘটনায় ১৯ জন, শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় ১২টি দুর্ঘটনায় ১২ জন ও বাহুবল উপজেলায় ১১টি দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত হয়েছেন।
জানা গেছে, ২০২৫ সালে জানুয়ারি মাসে বিভাগে ৩৩টি দুর্ঘটনায় ৩৬ নিহত ও ৬৮ জন আহত হন। এছাড়া ফেব্রুয়ারি মাসে ৩২টি দুর্ঘটনায় ৩২ নিহত ও ১৪৪ জন আহত, মার্চ মাসে ২৯টি দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত ও ৭৮ জন আহত, এপ্রিল মাসে ২৯টি দুর্ঘটনায় ৩০ নিহত ও ৪২ জন আহত, মে মাসে ৩৩টি দুর্ঘটনায় ৩৪ জন নিহত ও ৮২ জন আহত, জুন মাসে ২৯টি দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত ও ৪৮ জন আহত, জুলাই মাসে ২৬টি দুর্ঘটনায় ২৬ নিহত ও ৬১ আহত, আগস্ট মাসে ২৬টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত ও ৮২ জন আহত, সেপ্টেম্বর মাসে ৩২টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত ও ৩০ জন আহত, অক্টোবর মাসে ২৮টি দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত ও ১১০ আহত, নভেম্বর মাসে ২৬টি দুর্ঘটনায় ২৫ জন নিহত ও ৬৬ জন আহত, ডিসেম্বর মাসে ৩৩টি দুর্ঘটনায় ৩৭ জন নিহত ও ৬১ আহত হয়েছিলেন।
নিসচা কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট-চট্রগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মিশু গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে বলেন, স্থানীয় ৫টি দৈনিক পত্রিকা, ২টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন পত্রিকার তথ্য, অনুমেয় অনুজ্জ বা অপ্রকাশিত ঘটনা ও নিসচার শাখা সংগঠনগুলোর রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও নিসচা সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে সড়কে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিংয়ে অভাব, ট্রাস্কফোর্স কর্তৃক প্রদত্ত ১১১টি সুপারিশনামা বাস্তবায়ন না হওয়া, চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর প্রবণতা, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে ওভারটেকিং করা, লাইসেন্স ছাড়া চালক নিয়োগ, পথচারীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব, সিটবেল্ট ব্যবহার না করা, বিরতি ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালানো, চালকদের মাদকের আসক্তি, মহাসড়কে নির্মাণ ত্রুটি, গাড়িতে শিশুদের উপযোগী আসন না থাকা, সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল ও তিন চাকার গাড়ি বৃদ্ধি পাওয়া, মোটরসাইকেল চালকদের মানসম্মত হেলমেট ব্যববহার না করা, সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ না করা, রোড মার্কিং পর্যাপ্ত না থাকা, রাস্তার পাশে হাটবাজার ও দোকানপাট বসানো ও চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি চালানোকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার অভাব, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া, অশিক্ষিত ও অদক্ষ চালক দ্বারা গাড়ি চালানো ইত্যাদি দুর্ঘটনা মূল কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া জেলা পর্যায়ে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে অতিরিক্ত লোক সংখ্যা, অপর্যাপ্ত রাস্তা, মোটরসাইকেল ও রিকশার আলাদা লেন না থাকা, অবৈধ ব্যাটারিচালিত যান, সড়ক-মহাসড়কে উঠে বেপরোয়া গতিতে চলা, পথচারীদের নিয়ম না মানার প্রবণতা, জেব্রাক্রসিং, ওভারব্রিজ, আন্ডারপাস ব্যবহার না করে যত্রতত্র পারাপার ও রাস্তা চলাচল, রাস্তা পারাপার ও গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করাকে দায়ী করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে সিলেট বিভাগে ৩৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭৫ জন নিহত ও ৭০৯ জন আহত হয়েছিলেন।



