চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সোলার পাম্প

সেচের আওতায় ৩৬০০ হেক্টর জমি, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে ২০ হাজার টন

প্রকল্পের অধিনে সংশ্লিষ্ঠ দুই জেলার ২৩টি উপজেলায় ১২০ টি ১.৫ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন সোলার পাম্প স্থাপনের কাজ খুব দ্রুত এগিয়ে চলছে। সেচ কাজের জন্য নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার হবে এতে কৃষকদের বিদ্যুৎ খরচ লাগবে না।

এস এম রহমান, পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

Location :

Chattogram
সোলার পাম্প
সোলার পাম্প |নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের অধিনে এবার চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় কৃষকের মাঝে আশার আলো ছড়াচ্ছে নয়াবনযোগ্য শক্তিকে ব্যবহার করে নির্মিত সোলার পাম্প স্থাপনের কাজ।

প্রকল্পের অধিনে সংশ্লিষ্ঠ দুই জেলার ২৩টি উপজেলায় ১২০ টি ১.৫ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন সোলার পাম্প স্থাপনের কাজ খুব দ্রুত এগিয়ে চলছে। সেচ কাজের জন্য নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার হবে এতে কৃষকদের বিদ্যুৎ খরচ লাগবে না। একই পাম্পের সাথে ব্যারিড পাইপের মাধ্যমে সরাসরি কৃষি জমিতে সেচের পানি প্রবেশ করানো হবে এতে পানির অপচয় রোধ হবে এবং এই সোলার পাম্পের মাধ্যমে সেচের আওতায় আসছে তিন হাজার ৬০০ হেক্টর জমি আর এতে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে ১৯ হাজার ৮০০ টন। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে দেশে যখন জ্বালানী সংকট এবং বিদ্যুতের লোডশেডিং চলছে ঠিক সেই সময়ে কৃষকের দোরগোড়ায় নবায়নযোগ্য শক্তি (সূর্য্য) ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তির সোলার পাম্প কৃষকের মাঝে আশার আলো ছড়াচ্ছে।

চন্দনাইশ ও আনোয়ারা উপজেলার দায়ীত্বে নিয়োজিত বিএডিসির এসও আজমানুর রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় নয়টি সোলার পাম্প স্থাপনের কাজ চলছে ইতোমধ্যে সাতটিতে সেচ কার্যক্রম শুরু হয়েছে অপর দুইটি নির্মাণ কাজ চলছে। অপর দিকে আনোয়ারা উপজেলায় দুইটি সোলার পাম্পের মধ্যে একটিতে সেচ কাজ চলমান রয়েছে অপরটিও খুব দ্রুত চালু হবে।’

জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) কর্তৃক গৃহীত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্প প্রণোয়ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ওই প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি প্রায় ৭০ ভাগ ছাড়িয়ে গেছে।

গৃহীত এই প্রকল্পের বিভিন্ন কম্পন্টে গুলো বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে চট্টগ্রাম জেলার ১৫ উপজেলা ও কক্সবাজার জেলার আটটি উপজেলায় নতুন ভাবে সেচের আওতায় আসবে ১৮ হাজার ৯২০ হেক্টর অনাবাদি জমি। এতে দুই জেলায় প্রতিবছর ধান শাকসবজিসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে ৯৪ হাজার ৬০০ মেট্রিকটন। আর এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে ৬০২ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

যোগাযোগ করা হলে এই প্রকল্পের পিডি মো: নুরুল ইসলাম প্রকল্প কাজের অগ্রগতির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করছি।’

জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫২৫ কিলোমিটার সেচ ও নিস্কাশন খাল পূন:খনন করা হচ্ছে। পুন:খননকৃত খালে সেচের পানি সংরক্ষণ করার পাশাপশি খাল পুন:খননের ফলে জলাবদ্ধতা দূর হবে। ফলে এক ও দুই ফসলী জমি এখন দুই ও তিন ফসলী জমিতে রূপান্তর হবে। এছাড়া এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে খালে ভূপরিস্থ পানির প্রাপ্যাতা বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া পুনঃখননকৃত খাল ও নদীতে ২৩৫টি বিদ্যুৎচালিত এলএলপি স্থাপন করা হবে, ফলে প্রকল্প এলাকায় ১৮ হাজার৯২০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে এবং ৯৪ হাজার ৬০০ টন ধানসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি শস্যদানা উৎপাদিত বৃদ্ধি পাবে। যার বর্তমান বাজার মূল্য হবে ১৮৯ কোটি ২০ লাখ টাকা।

প্রকল্প পরিচালক বা (পিডি) মো: নুরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকল্পের মুল উদ্দেশ্য হচ্ছে এই দুইজেলায় সেচ অবকাঠামো নির্মাণ ও আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি নির্ভর সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করা। এবং আধুনিক প্রযুক্তির সোলার পাম্প স্থাপন করা।’

জানা গেছে, এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে জুলাই ২৩ থেকে আর প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ৩০ জুন ২০২৮ পর্যন্ত। আর এ প্রকল্পটি চট্টগ্রামের পটিয়া-চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, বাশঁখালী, আনোয়ারা, কর্ণফূলী, মিরেস্বরাই, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, সন্দ্বীপ, হাটহাজারী, বোয়ালখালী, লোহাগাড়া, ফটিকছড়ি ও সীতাকুন্ড এবং কক্সবাজারের সবকটি উপজেলায় একই সাথে এ প্রকল্প বাস্তায়নের কাজ চলছে। মূলত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে খাল পুনঃখনন ও সেচযন্ত্র সরবরাহ, আর্টেসিয়ান ও ডাগওয়েল স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় সেচ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে ৭৩,৭৯৫ হেক্টর জমিতে ভূ-উপরিস্থ পানি নির্ভর সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করে প্রতি বছর ৪,০৫,৮৭২.৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করাই মূল উদ্দেশ্য।

সরে জমিনে দেখা গেছে, এ প্রকল্পের দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন উপজেলায় খাল পূর্ণখননসহ বিভিন্ন সেচ অবকাঠামো নির্মান কাজ চলছে।

চলমান প্রকল্পে ৫২৫ কিলোমিটার সেচ ও নিষ্কাশন খাল পুনঃখনন, ২৩৫টি এলএলপি পাম্প স্থাপন, ১২০টি সোলার পাম্প স্থাপন, ৫০টি ভাগওয়েল নির্মাণ, ৫০০টি আর্টেসিয়ান ওয়েল স্থাপন, ৫২৯০০০ মিটার ব্যারিড পাইপ নির্মাণ, ৩০ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং ৯৮০টি সেচ অবকাঠামো নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে।

প্রকল্পের প্রতিবেদনে বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। দিন দিন এই জনসংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৫ ভাগ গ্রামে বাস করে এবং তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি উপর নির্ভরশীল। দেশের মোট ভূমির পরিমাণ নির্দিষ্ট হলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

ক্রমবর্ধমান এই জনসংখ্যার বসতভিটা তৈরী ও বিভিন্ন উন্নয়মূলক কর্মকান্ডের কারণে প্রতিবছর কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশে কৃষি জমির পরিমাণ মোট ভূমির ৭০.২%। মাথাপিছু কৃষি জমির পরিমাণ ১২.৫ শতক, প্রতিবছর ০.৫৬% হারে কৃষি জমি অকৃষি জমিতে রূপান্তরিত হচ্ছে তাতে ০.৮৬-১.১৬% ধান উৎপাদন কমছে ।এই হারে জমি হ্রাস পেতে থাকলে আগামী ৫০ বছরে কৃষি জমির পরিমাণ আরও ১৫% কমে যাবে। জমির পরিমাণ কমে এলে স্বাভাবিকভাবে ফসল উৎপাদনও হ্রাস পাবে । এছাড়া জলাবদ্ধতা, লবনাক্ততা, খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা ইত্যাদি দূর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুকিঁর প্রভাবতো আছেই। এমতাবস্থায়, দেশের এই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা আজ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশে উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল উৎপাদন অনেক আগেই শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধান ফসল ধান যা সেচ ব্যতিত চাষ করা অসম্ভব। অন্যান্য ফল ও সবজী উৎপাদনের জন্যও সেচ অপরিহার্য। এদিকে উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল আবাদের পূর্ব শর্ত হলো সেচ। সেচের পানি ছাড়া আশানুরুপ ফলন ফলানো একবোরেই অসম্ভব। প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার মোট আয়তন ৭৭৭৪৮০ হেক্টর এবং মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমান ২৬৫৬০১ হেক্টর হলেও এ দুই জেলায় মোট সেচকৃত জমি মাত্র ১২৯৬১৫ হেক্টর যা মোট চাষযোগ্য জমির ৪৮.৮০ ভাগ অর্থাৎ এখনো প্রায় অর্ধেকের বেশি চাষযোগ্য জমি সেচের আওতা বহির্ভূত রয়েছে। এ বিশাল পরিমাণ জমি পতিত ও সেচের বাহিরে রেখে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার বিপুল জমি চাষের আওতায় এনে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আধুনিক ও টেকসই সেচ ও আবাদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সরকার প্রকল্পটি প্রণয়ন করেছেন বলে গতকাল সন্ধায় জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম।