ট্রেনের যাত্রীদের পানি পান করিয়ে ছেলেকে খুঁজে ফেরেন মুন্নু

দুরারোগ্য ব্লাড ক্যান্সারে ছেলেকে হারিয়ে ছয় বছর ধরে ট্রেনের তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের তৃষ্ণা মিটিয়ে খুঁজে ফেরেন হারানো সন্তানকে।

এম মনিরুজ্জামান, রাজবাড়ী

Location :

Rajbari
পানি বিতরণ করছেন মুন্নু মিয়া
পানি বিতরণ করছেন মুন্নু মিয়া |নয়া দিগন্ত

‘টাকা ছাড়া ঠান্ডা পানি, টাকা ছাড়া কলের ঠান্ডা পানি, পানি খাওয়ার লোক নেই আর?’ —রাজবাড়ীর কালুখালি স্টেশনে ট্রেন এসে দাঁড়ালেই পানি ভর্তি বালতি হাতে প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের জানালায় এভাবেই হাঁকডাক দেন মুন্নু শেখ।

প্রথম দেখায় যে কেউ ভাববেন হকার, কিন্তু না। তিনি আসলে এক হতভাগ্য বাবা। যিনি দুরারোগ্য ব্লাড ক্যান্সারে ছেলেকে হারিয়ে ছয় বছর ধরে এভাবে ট্রেনের তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের তৃষ্ণা মিটিয়ে খুঁজে ফেরেন হারানো সন্তানকে।

পেশায় তিনি একজন চটপটি বিক্রেতা হলেও দুপুরে রাজশাহীগামী নকশিকাঁথা মেইল ট্রেন কালুখালী স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই তিনি বোতল ভর্তি পানির দুই বালতি পানি নিয়ে হাজির হন প্ল্যাটফর্মে। ট্রেন থামা মাত্রই তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের হাতে তুলে দেন ঠান্ডা পানির বোতল।

তিনি বলেন, ‘যখন ছোট কোনো শিশুর হাতে পানি তুলে দিই, তখন আমার ছেলে সবুজের মুখটাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে হয়, যেন ওকেই পানি খাওয়াচ্ছি। যতদিন বাঁচব, এভাবে পানি খাইয়ে যাব।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালে মুন্নু শেখের নয় বছর বয়সী ছেলে সবুজ শেখের ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ে। ছেলেকে নিয়ে নিয়মিত এই ট্রেনে করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাতায়াত করতেন তিনি।

অনেক সময় ফেরার পথে অসুস্থ ছেলেকে এক বোতল পানি কিনে দেয়ার মতো টাকাও থাকত না তার কাছে। দীর্ঘ লড়াই শেষে ক্যান্সারের কাছে হার মেনে ২০২০ সালে না ফেরার দেশে চলে যায় ছোট্ট সবুজ। সন্তানের মৃত্যু মুন্নুকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি তখন প্রতিজ্ঞা করেন, যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন ট্রেনে কোনো তৃষ্ণার্ত যাত্রীকে পানির কষ্ট পেতে দেবেন না।

সেই প্রতিজ্ঞা থেকেই প্রতিদিন ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা রাজশাহীগামী নকশিকাঁথা মেইল ট্রেন কালুখালী স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই নিজের চটপটির দোকান বন্ধ করে পানি সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। এরপর ঠান্ডা পানির বোতল হাতে ছুটে যান ট্রেনের প্রতিটি বগির সামনে। তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের হাতে তুলে দেন একে একে পানির বোতল।

মুন্নু শেখের ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় মুগ্ধ ট্রেনের যাত্রীসহ সাধারণ জনগণ। ট্রেনের যাত্রীদের পানি পান করিয়ে মৃত ছেলেকে খুঁজে ফেরেন মুন্নু শেখ।

ট্রেনযাত্রী আয়ুব মিয়া বলেন, ‘কাজের খোঁজে ফরিদপুরে গিয়েছিলাম। দুই দিন কাজ করার পর অসুস্থ হয়ে পড়ায় বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি। গরমে পানির পিপাসা লাগলেও ট্রেনে খাবার পানি না থাকায় খেতে পারিনি। কিন্তু কালুখালীতে এসে দেখি জানালা দিয়ে এক ব্যক্তি ‘টাকা ছাড়া পানি, পানি’ বলে ডাকছেন। সেই পানি খেয়ে তৃষ্ণা মিটালাম। এখনো যে ভালো মানুষ আছে, তার প্রমাণ এই পানিওয়ালা।’