কবি আবদুল হাই শিকদার

মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা লাঘব হয়েছে জুলাইয়ে

কবি ও সাংবাদিক আবদুল হাই শিকদার বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা লাঘব হয়েছে জুলাইয়ে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান অনিবার্যই ছিল।

চট্টগ্রাম ব্যুরো

Location :

Chattogram
আইআইইউসির জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে কবি আবদুল হাই শিকদার
আইআইইউসির জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে কবি আবদুল হাই শিকদার |নয়া দিগন্ত

দেশবরেণ্য কবি ও সাংবাদিক আবদুল হাই শিকদার বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা লাঘব হয়েছে জুলাইয়ে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান অনিবার্যই ছিল। কারণ, জুলাইয়ের রক্তে মিশে আছে পলাশীর বক্ষবিদীর্ণ করা হাহাকার, মিশে আছে বরকত-রফিকের রক্ত, মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদের আত্মত্যাগের অসীম ব্যঞ্জনা। মিশে আছে শহীদ জিয়ার রক্ত, দেশপ্রেম, সততা ও সৌন্দর্য।

তিনি বলেন, জুলাই শুধু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নয়, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ছিল। আমরা এখনও নিজের অজান্তে আধিপত্যবাদকে সেজদা করছি। আমাদেরকে সাংস্কৃতিক বিরোধ বুঝতে হবে, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বুঝতে হবে।

তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ক্ষোভ এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা। তাই জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে শুধু একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দেখার সুযোগ নেই; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সাহস, আত্মমর্যাদা ও দেশপ্রেমের এক অনন্য প্রেরণা।

বুধবার আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)-এর আয়োজনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ পালন অনুষ্ঠানে দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার প্রধান আলোচকের বক্তব্যে কথাগুলো বলেন।

এ উপলক্ষে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি চত্বর থেকে একটি বিজয় র‌্যালি বের করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা, জুলাই স্মৃতিচারণ, জুলাই স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন, তথ্যচিত্র প্রদর্শনী ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ শাহজাহান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ হাসমত আলী।

শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য প্রফেসর ড. আবু বকর রফিক আহমদ, আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরী, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কর্নেল মোহাম্মদ কাশেম, পিএসসি (অব.) এবং ফ্যাকাল্টি অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজের ডিন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ কাউসার আহমেদ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর প্রফেসর মোস্তফা মনির চৌধুরী। আবৃত্তি পরিবেশন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও আবৃত্তিশিল্পের শিক্ষক মোসতাক খন্দকার।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে বক্তব্য রাখেন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর সাইফুর রহমান চৌধুরী, স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনের সিনিয়র সহকারী পরিচালক আবদুস সেলিম, ছাত্রী জুলেখা আকতার, ছাত্র রিয়াজুল হক ও শহীদুল ইসলাম।

দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন কুরআনিক সায়েন্সেস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. বি. এম. মফিজুর রহমান আল-আযহারী।

আবদুল হাই শিকদার বলেন, জুলাই মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অটল অবস্থান, সাহসিকতা, আত্মত্যাগ ও বিজয়ের প্রতীক। জুলাই অজর, অমর; এটি জাতির সংগ্রামী ইতিহাসের এক অবিনাশী অধ্যায়, যা আগামী প্রজন্মকে ন্যায়, সত্য ও দেশপ্রেমের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে। দীর্ঘ ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রাম, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা এবং দেশের তরুণ প্রজন্মের অসীম সাহস, আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে সংঘটিত হয় বিশ্বজুড়ে আলোচিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান। বিশেষ করে কোটা সংস্কার আন্দোলনের টানা ৩৬ দিনের সংগ্রাম শুধু একটি দাবির আন্দোলন ছিল না; এটি ধীরে ধীরে মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।

তিনি বলেন, এক হাজার বছরেও আবু সাঈদের মতো বীর জন্মায়নি। জুলাই জাদুঘর উদ্বোধন একটি প্রশংসনীয় কাজ উল্লেখ করে তিনি এই অনুষ্ঠানে প্রফেসর ড. ইউনূসকে রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে। সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার সংরক্ষণ করতে হবে।

বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, দুই বছরের মাথায় এসে আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি কিছু বুদ্ধিজীবী জুলাইয়ের চেতনাকে আবার মুছে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। তাদের সাংস্কৃতিক যোদ্ধারা আজকে সক্রিয়। তিনি বলেন, জুলাইয়ের এই দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে দাঁড়িয়ে, জুলাই বিপ্লবের জন্য যে ঐক্য রচিত হয়েছিল, আমাদের সেই জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করে জুলাইয়ের চূড়ান্ত ফলাফল রাষ্ট্রকাঠামোতে সংস্কার, রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা, সত্যিকারের বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ, ন্যায়ের বাংলাদেশ, আইনের শাসনের বাংলাদেশ, মানবিক মর্যাদা যেখানে নাগরিকরা পাবে— সে ধরনের একটি বাংলাদেশ যদি আমরা পেতে চাই, তবে আমাদেরকে আবার বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হবে, গবেষণার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হবে, রাজপথের লড়াইয়েও আমাদেরকে অবতীর্ণ হতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ হাসমত আলী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগ জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচককে সম্মাননা জানানো হয়। পাশাপাশি জুলাই স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।