ঘিওরে লেবুর দামে আগুন

প্রান্তিক চাষীরা বলছেন, মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের কারণে তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে খুচরা বাজারে ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে চড়া দাম। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে লেবুর দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন থেকে চার গুণ।

আব্দুর রাজ্জাক, ঘিওর (মানিকগঞ্জ)

Location :

Manikganj
লেবু তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা
লেবু তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা |নয়া দিগন্ত

রমজান মাসের শুরুতেই মানিকগঞ্জের ঘিওরে লেবুর বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যে গ্রামগুলোতে ব্যাপক লেবু উৎপাদন হয়, সেখানেই এখন দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

প্রান্তিক চাষীরা বলছেন, মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের কারণে তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে খুচরা বাজারে ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে চড়া দাম। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে লেবুর দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন থেকে চার গুণ।

সরেজমিনে দেখা যায়, আকার ও মানভেদে খুচরা বাজারে এক হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১০০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও যার দাম ছিল ২০ থেকে ২৫ টাকা। পাইকারি বাজারে একই লেবু বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৬০ টাকায়। একাধিক হাতবদলের পর খুচরা বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দাম হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

ঘিওর উপজেলার ‘লেবু গ্রাম’ খ্যাত বালিয়াখোড়া ও সোদঘাটা গ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৬০টি লেবু বাগান রয়েছে। সহস্রাধিক মানুষ উৎপাদন ও বিপণন কাজে জড়িত। এখানে কলম্বো, এলাচি ও কাগজি জাতের লেবু চাষ হয় বেশি।

বাগান মালিকদের অভিযোগ, রমজানকে ঘিরে একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র আগেভাগেই দাদনের মাধ্যমে বাগান কিনে নেন। ফলে বাজারে দাম বাড়লেও প্রকৃত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হন প্রান্তিক চাষীরা।

বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে উপজেলার বালিয়াখোড়া এলাকার ১১টি বাগান ঘুরে দেখা যায়, লেবু তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। পাইকাররা সেখান থেকে লেবু কিনে ঢাকার বিভিন্ন বাজারে পাঠাচ্ছেন।

বালিয়াখোড়া গ্রামের বাগান মালিক আজিজুর রহমান বলেন, ‘এই মৌসুমে স্বাভাবিকভাবেই ফলন কিছুটা কম থাকে। এরসাথে সার, কীটনাশক ও পরিচর্যার খরচও বেড়েছে। রমজানে চাহিদা বেশি থাকায় দাম কিছুটা বাড়ে, কিন্তু পাইকারদের সিন্ডিকেটের কারণে আমরা ন্যায্য মূল্য পাই না। মাঠ থেকে কম দামে কিনে নিয়ে পরে কয়েক হাত ঘুরে সেই লেবুই কয়েকগুণ দামে বিক্রি হয়।’

একই গ্রামের চাষী প্রিতুল মিয়া জানান, তাদের পরিবারের প্রায় ২০ বিঘা লেবুর বাগান রয়েছে। প্রায় ৩০ বছর ধরে তারা এই চাষের সাথে জড়িত। তিনি বলেন, ‘রমজানে কিছুটা লাভের আশায় থাকি। কিন্তু সার ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় সেই লাভও টেকে না। বাজারে দাম বেশি হলেও তার সুফল আমরা পাই না। কোনোমতে খরচ তুলে বাগান টিকিয়ে রাখছি।’

উপজেলার বিভিন্ন পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্রে মানভেদে এক হালি লেবু ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে খুচরা বাজারে একই লেবু ৭০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা।

খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন লেবুর ভরা মৌসুম নয়। পাইকারদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় যোগ করে তাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়াচ্ছেন না বলে দাবি করেন।

সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, রমজান এলেই কিছু ব্যবসায়ী নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির করে তোলে। লেবু ইফতারের অপরিহার্য অংশ হওয়ায় এই সুযোগে দাম বাড়ানো হচ্ছে।

প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত বাজার তদারকির দাবি জানিয়েছেন তারা, যাতে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি না হয়।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ৩২৬ হেক্টর জমিতে লেবুর আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে ঘিওর, সাটুরিয়া ও সিংগাইর উপজেলায় আবাদ বেশি। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে জেলার উৎপাদিত লেবু ঢাকার বড় বাজারগুলোতেও সরবরাহ করা হয়। তবে যেখানে ফলন সবচেয়ে বেশি, সেখানেই দাম বৃদ্ধির এ চিত্র স্থানীয়দের হতাশ করেছে।

ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাশিতা তুল ইসলাম বলেন, ‘কাঁচাবাজারের কয়েকটি পণ্যে দাম বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। কোনো কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মূল্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

রমজানের শুরুতেই লেবুর ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়ছে অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারেও। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, রমজানজুড়ে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া হবে।