চুয়াডাঙ্গা বাজারে কোরবানির পশু, দাম নিয়ে শঙ্কায় খামারিরা

চলতি মৌসুমে চুয়াডাঙ্গায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে দুই লাখ দুই হাজার ২৩৯টি গবাদিপশু। এর মধ্যে রয়েছে ৪৪ হাজার ৩৯৬টি গরু, ১১৬টি মহিষ, এক লাখ ৫৫ হাজার ২০০টি ছাগল এবং প্রায় আড়াই হাজার ভেড়া।

মনিরুজ্জামান সুমন, দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)

Location :

Chuadanga
কোরবানির হাট
কোরবানির হাট |নয়া দিগন্ত

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গার কোরবানির পশুর হাটে দেশী পশুর জোয়ার এসেছে। জেলার খামারি ও কৃষকরা দেশীয় পদ্ধতিতে লালন-পালন করা প্রচুর সংখ্যক গরু, ছাগল ও ভেড়া হাটে নিয়ে আসায় জমে উঠেছে কেনাবেচা। খামারিদের চোখে এখন স্বপ্ন, ভালো দামে পশু বিক্রি করে বছরের পরিশ্রমের সঠিক মূল্য পাওয়ার। তবে সেই স্বপ্নের পাশেই ভর করেছে অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তা। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম মিলবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে চুয়াডাঙ্গায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে দুই লাখ দুই হাজার ২৩৯টি গবাদিপশু। এর মধ্যে রয়েছে ৪৪ হাজার ৩৯৬টি গরু, ১১৬টি মহিষ, এক লাখ ৫৫ হাজার ২০০টি ছাগল এবং প্রায় আড়াই হাজার ভেড়া। বিপরীতে জেলার সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার ১৮১টি পশু। সেই হিসাবে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ৭১ হাজার ৬৬টি পশু প্রস্তুত রয়েছে। তাদের হিসাবে এবছর এক হাজার কোটি টাকা বাণিজ্য হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, জেলার চাহিদা পূরণ করেও বিপুলসংখ্যক পশু ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। দেশীয় ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে মোটাতাজাকরণ করা এসব পশুর মধ্যে ছোট, মাঝারি ও বড় সব ধরনের গরুই রয়েছে। ক্রেতাদের সামর্থ্য ও চাহিদা বিবেচনায় পশুর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ টাকা থেকে শুরু করে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত।

চুয়াডাঙ্গার চারটি উপজেলা, সদর,আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগরের খামারিরা কয়েক মাস ধরেই পশু লালন-পালনে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পশুর খাবার, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসেবার দিকে রাখা হচ্ছে বাড়তি নজর। অনেক খামারেই বিশেষ খাদ্যতালিকা, ভিটামিন ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে পশু প্রস্তুত করা হয়েছে।

তবে এবারের মৌসুমে খামারিদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র গরম ও লোডশেডিং। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে পশু অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায় খামারগুলোতে সার্বক্ষণিক ফ্যান চালানো, পানি ছিটানো এবং ঠান্ডা পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাড়তি ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা।

আলমডাঙ্গা উপজেলার খামারি শাহীন বলেন, ‘প্রতি বছর তিনি ১৫০ থেকে ২০০টি গরু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারা তার খামারে আসেন।’

তিনি বলেন, ‘ভালো জাতের গরু লালন-পালনে অনেক খরচ হয়। কিন্তু এবার অনেক ক্রেতাই খুব কম দাম বলছেন। এতে লাভ তো দূরের কথা, খরচ ওঠানো নিয়েও চিন্তায় আছি।’

খামারের কর্মী শামসুল আলম বলেন, ‘এবার গরম অনেক বেশি। পশুকে সুস্থ রাখতে সারাক্ষণ ফ্যান চালাতে হয়েছে, বারবার পানি ছিটাতে হয়েছে। খাবারের দিকেও বিশেষ নজর রাখতে হয়েছে। এতে শ্রম ও খরচ দুটোই বেড়েছে।’

খামারিদের দাবি, পশুখাদ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল তাদের চাপে ফেলেছে। অনেকেই ব্যাংক এনজিও থেকে ঋণ এবং ধারদেনা করে খামার পরিচালনা করছেন। তাই বাজারে ন্যায্য দাম না পেলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন তারা।

চুয়াডাঙ্গা এ অঞ্চলে শাইওয়াল ও ফ্রিজিয়ান জাতের গরু পালনের প্রবণতা বেশি। পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গা জেলার ব্রান্ড খ্যাত ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলেরও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। স্থানীয় খামারিরা মনে করছেন, এবারের বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে আগামী বছর আরো বড় পরিসরে খামার সম্প্রসারণ করবেন তারা।

চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ডা: শামীমুজ্জামান বলেন, ‘জেলার আটটি পশুর হাটে আমাদের টিম কাজ করছে। পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপদ কেনাবেচা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, এবারের মৌসুমে চুয়াডাঙ্গায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার পশু বাণিজ্য হবে।’

ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে জেলার পশুর হাট। খামারিদের প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত ক্রেতারা দেশীয় খামারের স্বাস্থ্যসম্মত পশুর মূল্য বুঝবেন, আর বছরের দীর্ঘ পরিশ্রমে মিলবে স্বস্তির হাসি।