রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থী ফুরকান উদ্দিনকে পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে মারধরের অভিযোগের ঘটনায় অভিযুক্ত ট্রেন টিকিট পরীক্ষক (টিটিই) সুমনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। একইসাথে ঘটনার তদন্তে দুটি পৃথক কমিটি গঠন, আহত শিক্ষার্থীর চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে রাতের আন্তঃনগর ট্রেনের স্টপেজ পুনরায় চালুসহ শিক্ষার্থীদের বেশ কয়েকটি দাবি মেনে নেয়া হয়েছে।
এসব সিদ্ধান্তের পর মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে প্রায় আট ঘণ্টা পর রাজশাহীর সাথে সারাদেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
এর আগে সকালে অভিযুক্ত টিটিইর শাস্তি ও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা গেটসংলগ্ন রেললাইন অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। ফলে রাজশাহীর সাথে সারাদেশের ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেন আটকে পড়ে এবং শত শত যাত্রী মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুপুরে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো: ফরিদুল ইসলাম, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলিম এবং প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভিযুক্ত টিটিই সুমনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ দায়-দায়িত্ব ও গাফিলতি খতিয়ে দেখতে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে সদর দফতরের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এছাড়া অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতিনিধি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকারী প্রক্টর, বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রতিনিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম মিয়াকে সদস্য করা হয়েছে।
দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে রাতের পদ্মা এক্সপ্রেস, তিতুমীর এক্সপ্রেস ও সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস ট্রেনের স্টপেজ পুনর্বহালের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য ট্রেন, বিশেষ করে রাতের ট্রেনের সময়সূচির সাথে সমন্বয় করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে রাজশাহী রেলস্টেশন পর্যন্ত শাটল বাস চালুর উদ্যোগ নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আহত শিক্ষার্থী ফুরকান উদ্দিনের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্বও নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রয়োজনে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল সেন্টারের সাথে সমন্বয় করে তার চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে।
এছাড়া গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য আগামী ৬ আগস্ট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে আরেকটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে।
বৈঠক শেষে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো প্রশাসন ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে কোনো শিক্ষার্থী এমন ঘটনার শিকার না হন, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি মিলেছে। এসব আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছি।’
এরপর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে শিক্ষার্থীরা রেললাইন ছেড়ে দিলে ধাপে ধাপে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। প্রায় আট ঘণ্টা পর রাজশাহীর সাথে সারাদেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের প্রশাসক অধ্যাপক এস এম কামরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতনের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শুরু থেকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। ঘটনার পরপরই ভিসি ও দুই প্রো-ভিসি ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেন এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেন। প্রশাসনের এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণে জরুরি বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।



