ফরিদপুর জিলা স্কুলে জেমসের কনসার্টে বহিরাগতদের সাথে শিক্ষার্থীদের হট্টগোলের কারণে অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ার পরই ফেসবুকে এ ঘটনায় পাঁচজন নিহতের গুজব ছড়িয়ে দেন দেব দুলাল গুহ নামে এক ব্যক্তি। তার এ পোস্টের পর ভারতে অবস্থানকারী বিতর্কিত লেখিকা তাসলিমা নাসরিন রিপোর্ট করে এ ঘটনাকে তৌহিদী জনতার তাণ্ডব বলে অভিযোগ করেন।
এ নিয়ে ভারতের অনেক অনলাইনে ভুয়া নিউজও ছাপা হয়েছে পাঁচজনের মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করে। যার মধ্যে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও রয়েছে।
শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) রাতে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে দেব দুলাল গুহ এ সংক্রান্ত পোস্টটিতে তার ওপর হামলা করা হয় দাবি করে লিখেন— ‘রণক্ষেত্র ফরিদপুর জিলা স্কুল। শিল্পী জেমস জানে বাঁচলেও কমপক্ষে ৫ জন মৃত ও শতাধিক আহত।
নগর বাউল জেমস কোনোমতে জীবন হাতে নিয়ে পালিয়েছেন আমার দেয়া আগাম তথ্যের ভিত্তিতে। তবে যুদ্ধ এখনও চলছে। এর দায় ১৮৫ বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটিকে নিতে হবে। আমার কথা শুনলে তারা এই জীবনগুলো বাঁচাতে পারতেন। উল্টো তারা আমার ওপর হামলা করেছেন। কমিটির অপকর্মের প্রতিবাদে কিছু পরামর্শ দেয়ায় পূর্বেই হুমকিদাতাদের ইন্ধনে আমার ওপর হামলা হয়। (বিস্তারিত কমেন্টে)’
দেব দুলাল গুহের এই পোস্টের পরে রাত ১টা না পেরোতেই তসলিমা নাসরিন তার ভেরিফাইড পেজে রি-পোস্ট করেন। তিনি লিখেন— ‘ফরিদপুর জিলা স্কুলে জেমসের প্রোগ্রাম পণ্ড হলো। জেমসকে গান গাইতে দেবে না তৌহিদী জনতা। দেশে ছায়ানট থাকবে না, উদীচী থাকবে না, বাউল থাকবে না, নগর বাউল থাকবে না, তবলা হারমোনিয়াম গিটার থাকবে না। সুর থাকবে, সে শুধু আজানের সুর। আর কোনো সুর নয়। জিহাদিদের সাফ কথা। মানলে ভাল। না মানলে মুণ্ডু যাবে। ভিডিও : দেব দুলাল গুহ, ফেসবুক।’
কিন্তু ফরিদপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায় ভিন্ন ঘটনা। শিক্ষার্থীরা জানান, ফরিদপুর জিলা স্কুলের গৌরবময় ১৮৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে পুনর্মিলনীর আয়োজন করা হয়েছিল দু’ দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানমালা নিয়ে। আর এতে একেবারে শেষদিনেই ছিল মূল চমক নগর বাউল ব্যান্ডের গায়ক জেমসের কনসার্ট।
এই সিডিউল ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয়েছিল অনুষ্ঠানের প্রতীক্ষা। কিন্তু আয়োজকরা সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, স্কুলের শিক্ষার্থীদের বাইরে কনসার্টের মাঠে কাউকে ঢুকতে দেয়া হবে না। কার্ড দেখিয়ে তবেই মাঠে প্রবেশের অনুমতি মিলবে।
কিন্তু বাইরের ছেলেরা নানাভাবে চেষ্টা করছিল মাঠে প্রবেশের। কিন্তু অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত লগ্নে এসেও তারা মাঠে ঢুকতে না পেরে ভিড় করেন স্কুলের সামনের রাস্তায়। সেখানে তখন হাজারের ওপরে দর্শক।
রাত ৯টার পরেই ঘটে বিপত্তি। মঞ্চে তখনো ওঠেনি জেমস। শেষ পুরস্কারটি তুলে দিচ্ছিলেন অতিথিরা। এমন সময়েই তিনজন ছেলে দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করার সময় পড়ে যায়। আর তখন নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের ধরে পিটুনি দেয়।
বাইরে এই খবর পৌঁছাতেই লেগে যায় হুড়োহুড়ি। ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয় বাইরের অপেক্ষারত দর্শকদের মধ্য থেকে। তেড়ে আসে জিলা স্কুলের ছেলেরাও। প্রায় ঘণ্টাখানেক এ অবস্থা চলার সময় বেশ কয়েকজন রক্তাক্ত হয়। অনেকের মাথাও ফেটে যায়। তবে কারো অবস্থাই আশঙ্কাজনক নয়।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলার এক খবরে তারা লিখেছে— ‘বাংলাদেশে ফের অশান্তির ছায়া সংস্কৃতি মহলে। হামলার জেরে বাতিল হয়ে গেল জনপ্রিয় গায়ক জেমসের কনসার্ট। তার কনসার্টে হামলার ঘটনা বাংলাদেশে মৌলবাদী শক্তির বাড়-বাড়ন্তের জলন্ত ইঙ্গিত করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ছায়ানট, উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পী, সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের অফিস বারবার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। সমালোচকদের অভিযোগ, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ। তাদের মতে, আসন্ন ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো হচ্ছে।’



