ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (মমেক)-এ হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি এখন আর কেবল উদ্বেগের নয়- এটি স্পষ্টতই এক গভীর জনস্বাস্থ্য সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। টিকা নেয়ার আগেই একের পর এক শিশু মৃত্যু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনাকে সামনে এনে দিয়েছে।
গত ১৭ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৩৬ শিশু। এর মধ্যে ২৪ মে পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়- মৃতদের প্রায় ৭৭ শতাংশের বয়স ৯ মাসের নিচে। অর্থাৎ, যারা এখনো হামের টিকা পাওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে।
স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী, শিশুকে ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম টিকা দেয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে- এই সময়ের আগ পর্যন্ত শিশুদের সুরক্ষা কিভাবে নিশ্চিত করা হবে? বাস্তবে সেই সুরক্ষার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, মৃত ৩৬ শিশুর মধ্যে ২৪ জনের বয়স ০ থেকে ৯ মাস। শুধু ময়মনসিংহ নয়, নেত্রকোনা, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও টাঙ্গাইল থেকেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর আসছে। ফলে এটি এখন পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এক উদ্বেগজনক সংক্রমণে রূপ নিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ৯ মাসের আগে টিকা না দেয়া গেলেও বিকল্প প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ ছিল। গর্ভবতী মায়েদের টিকাদান, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং জনসচেতনতা বাড়াতে ঘাটতির বিষয়টি সামনে এসেছে। পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর অবস্থায় দেরিতে হাসপাতালে নেয়াও মৃত্যু ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
আইসিইউ সঙ্কটে বাড়ছে মৃত্যু
মমেক হাসপাতালের চিত্রও নাজুক। হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে মাত্র ৬৪টি, অথচ রোগী ভর্তি শতাধিক। এতে বাধ্য হয়ে অনেক শিশুকে মেঝে ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে- যা সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি আরো বাড়াচ্ছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, মৃত বেশির ভাগ শিশুরই আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন ছিল। কিন্তু শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। তাদের মতে, পর্যাপ্ত আইসিইউ থাকলে অনেক শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হতো।
নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিস্থিতি
১৭ মার্চ থেকে ২৪ মে পর্যন্ত মমেক হাসপাতালে মোট ১ হাজার ৫৭৯ জন হাম রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৪৭১ জন। তবে আক্রান্তের এই হারই প্রমাণ করে- পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে- টিকা নেয়ার আগেই শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? কেন আগে থেকে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি? কেন এখনো আইসিইউ ও শয্যা সঙ্কট কাটেনি?
একটি দায়িত্বশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এমন মৃত্যু মেনে নেয়া কঠিন। অথচ অবহেলা, সমন্বয়হীনতা ও সীমিত সক্ষমতার কারণে প্রতিনিয়ত ঝরে পড়ছে নিষ্পাপ প্রাণ।
মমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, অনেক রোগী জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসায় চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি অভিভাবকদের শিশুদের মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই মৃত্যু মিছিল আরো দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।



