কিশোরগঞ্জে হাওরে পাকা ধান তলিয়ে গেছে, কাঁদছে কৃষক

বিস্তীর্ণ হাওর। চোখ যেদিকে যায়, পানির নিচে শুধু ধান আর ধান! দুই দিন আগেও এসব ধান বাতাসে দুলছিল। সোনালী রং ধারণ করা ধানের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছিল হাওরে। পাকা ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কৃষকেরা। এরই মধ্যে ঘটে যায় সর্বনাশ। টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে সব ধান পানিতে তলিয়ে যায়।

মো: আল আমিন, কিশোরগঞ্জ

Location :

Kishoreganj
কিশোরগঞ্জে হাওরে পাকা ধান তলিয়ে গেছে, কাঁদছে কৃষক
কিশোরগঞ্জে হাওরে পাকা ধান তলিয়ে গেছে, কাঁদছে কৃষক |নয়া দিগন্ত

বিস্তীর্ণ হাওর। চোখ যেদিকে যায়, পানির নিচে শুধু ধান আর ধান! দুই দিন আগেও এসব ধান বাতাসে দুলছিল। সোনালী রং ধারণ করা ধানের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছিল হাওরে। পাকা ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কৃষকেরা। এরই মধ্যে ঘটে যায় সর্বনাশ। টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে সব ধান পানিতে তলিয়ে যায়।

গত দুই দিনে কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জের হাওরে অন্তত আড়াই হাজার হেক্টর বোরো জমির ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ও আদমপুর ইউনিয়নে দুই হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। একইভাবে এর সীমান্তবর্তী হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার শিবপুর ও মাদনা এলাকায় ৫০০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে।

রোববার (২৬ এপ্রিল) বিকেলে অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর হাওরে গিয়ে দেখা গেছে, কৃষকেরা ‘গলাডোবা’ ধান কাটছেন। নৌকা দিয়ে এসব ধান কেটে পাড়ে আনা হচ্ছে। অতিরিক্ত শ্রমিক খরচ দিয়ে কোনো রকমে কেউ কেউ ধান কেটে তুলছেন।

অনেক জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। যে ধান কয়েক দিনের মধ্যে ঘরে তোলার কথা ছিল, তা এখন পানির নিচে। হাঁটু বা কোমর পানিতে নেমে কেউ কেউ ধান কাটলেও অনেক কৃষকই আশা ছেড়ে দিয়েছেন।

মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আব্দুল্লাহপুর হাওরে এবার ১০ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন কৃষক রতন মিয়া (৬৫)। পুরো পরিবারের খাওয়াদাওয়া, বাচ্চাদের লেখাপড়াসহ সব খরচই আসে এই ধান থেকে।

শ্রমে-ঘামে ফলানো সেই ধান এবার তলিয়ে গেছে পানিতে। এক ছটাক ধানও তুলতে পারলেন না তিনি। সামনে একটা বছর কীভাবে যাবে, আর ঋণের টাকাই কী দিয়ে পরিশোধ করবে, এই চিন্তায় দিশাহারা কৃষক রতন মিয়া।

কলিমপুর গ্রামের এই কৃষকের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১১ জন। তলিয়ে যাওয়া জমির ধান দেখে হাওরপারে বসে তিনি পরিবারসহ কাঁদছিলেন। সেখানে কথা হয় তার সাথে। ‘ভাই সংবাদ কইরা কী আর অইব, আমার সর্বনাশ অয়া গেছে। সোনার ধানগুলো পাইক্কা গেছিন, আর কয়েকটা দিন গেলেই কাটতে পারতাম। একটা ধানও ঘরে আনতে পারলাম না। এহন পরিবার নিয়া কেমনে চলাম আমি।’ ধানের অবস্থা জিজ্ঞেস করায় আক্ষেপ করে বলছিলেন তিনি।

শুধু রতন মিয়াই নন, গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে হাওরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তার মতো ফসলের ক্ষতিতে পড়েছেন হাজারো কৃষক।

পরিবেশ না মেনে হাওরে উঁচু রাস্তা নির্মাণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পলি জমে নদী ভরাট হওয়া এবং যে বাঁধ ফসল রক্ষা করবে, কোথাও কোথাও সেই বাঁধের জন্যই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

কৃষক রতন মিয়ার সাথে কথা বলার সময় ভেজা কাপড়ে ধান ক্ষেত থেকে উঠে এসে কাবিল মিয়া (৬০) নামে এক কৃষক হাতের মুঠোয় থাকা কিছু ধান দেখিয়ে বলছিলেন, ‘দেহুইন আধা-পাকা অয়া গেছিল ধান। দুই একদিন গেলেই কাটার চেষ্টা করতাম। মনরে বুঝ দিতাম। পানির নিচের ধান এহন কেমনে কাটাম। ধান পইচ্চা কালা অয়া যাইতাছে। আহারে চোখের সামনে ধান নষ্ট অইয়া যাইতাছে। কইলজাডারে মানাইতে পারতেছি না।’ বলেই কান্না শুরু করে দিলেন।

হাওর পারে কথা হয় একই গ্রামের কৃষক হযরত আলীর (৫৫) সাথে। তিনি জানান, উজানের পানি নামলেই এই হাওরে পানি ঢুকে পড়ে। হবিগঞ্জ সীমানার শিবপুর এলাকার খোয়াই নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতিবছরই কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম অংশে জলাবদ্ধতা হয়। হবিগঞ্জেরও কিছু হাওরে পানি জমে।

কথা হয় হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার শিবপুর গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলামের (৪৮) সাথে। হাওরে তার ৯ একর জমির মধ্যে সাত একরই তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে, পানি না কমলে বাকি জমিও তলিয়ে যাবে। এখন এসব জমিতে পানি থাকায় ধানগাছের গোড়ায় পচন ধরেছে।

একই এলাকার কৃষক রমজান আলী (৬০) বলছিলেন, এবার বোরো আবাদ করতে গিয়ে তার দেড় লাখ টাকা ঋণ করতে হয়েছে।ধান ধান বেছেই ঋণ পরিশোধ করার কথা ছিল। ধান পাকতে শুরু করেছিল। এর মধ্যেই সব পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন সেই ঋণ কিভাবে দেবেন, আর বাকি একটা বছর কিভাবে চলবেন, সেই চিন্তায় তিনি এখন অস্থির।

রমজান আলী বলেন, ‘কী আর করাম, বুকটা ফাইট্টা যাইতাছে। সন্তানের মতো ধান। দুই-তিনটা মাস লালন পালন কইরা বড় করছি। সোনালী রং হয়েছিল। দুই দিন আগেও ধানের শিষগুলো ধইরা আইছি। এহন এইগুলো পানির নিচে।’

এদিকে পাকাধান তলিয়ে গিয়ে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হলেও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কাছে সেই ক্ষতির হিসাব নেই। তারা বলছে, হাওরে দুই দফায় জলাবদ্ধতায় ধান তলিয়ে গেছে। প্রথম দফায় ২০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যায়। গত দুইদিনে মাত্র ৯ হেক্টর বোরো ধান তলিয়ে যায়। তবে এ হিসাবকে হাস্যকর বলছেন হাওরের কৃষকেরা।

কৃষকদের দাবি, সব মিলিয়ে হাওরে দুই থেকে আড়াই হাজার হেক্টর বোরো ধানের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এবার কিশোরগঞ্জে ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৬ মেট্রিক টন। বৈশাখের প্রথম দিন থেকে হাওরে ধান কাটা শুরু হয়।

অধিদফতরের উপপরিচালক ডা: মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান বলেন, পলি পড়ে নদীর পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অষ্টগ্রামের হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতায় পুরো ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পেতে আরো কয়েক দিন লাগবে। দধানগাছ যদি ৫ থেকে ৬ দিন নিমজ্জিত থাকে, তাহলে ক্ষতি হবে। এর আগে যদি পানি নেমে যায়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ কম হবে।