কুষ্টিয়ায় কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে এবার দেখা দিয়েছে চরম মন্দাভাব। চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় যেমন সাধারণ বিক্রেতারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তেমনি ব্যবসায়ীরাও বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের আশঙ্কা করছেন। ব্যবসায়ীদের দাবি, ল্যাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত পশুর চামড়া নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ট্যানারিগুলোর কঠোর অবস্থানের কারণে বাজারে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু আড়তদার ল্যাম্পি রোগকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কম দামে চামড়া কিনছেন।
জানা গেছে, চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেকেই চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি না করে মাদরাসায় দান করেছেন। কেউ কেউ আবার চামড়া মাটিচাপাও দিয়েছেন।
কুষ্টিয়ার বৃহত্তম চামড়া মোকাম আড়ুয়াপাড়া ও বাবর আলী গেট এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, ঈদের দিন দুপুরের পর থেকে চামড়া কেনাবেচা শুরু হয়। বড় আকারের কিছু গরুর চামড়া এক হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও অধিকাংশ চামড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। ল্যাম্পি রোগে আক্রান্ত বলে ধারণা করা চামড়ার দাম নেমে এসেছে ১০০ থেকে ২০০ টাকায়।
চামড়া ব্যবসায়ী ও এসএম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শামসুল ইসলাম বলেন, “এবার কুষ্টিয়ায় চামড়ার আমদানি অনেক কম। বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ গরুর চামড়ায় ল্যাম্পি রোগের ক্ষতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। এসব চামড়া কিনলে পরে ট্যানারি গ্রহণ না-ও করতে পারে।”
তিনি বলেন, “বড় আকারের ভালো চামড়া সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পর্যন্ত কেনা হয়েছে। মাঝারি চামড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু ল্যাম্পি আক্রান্ত চামড়ার দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকার বেশি ওঠেনি।”
মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন বলে জানান তিনি। গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে চামড়া কিনে আড়তে এসে অনেকেই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
শামসুল ইসলাম আরো বলেন, “চামড়া শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে সরকারি সহায়তার বেশিরভাগই ট্যানারি মালিকদের কাছে চলে যায়। ফলে আড়তদাররা ক্রমেই এই ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।”
তিনি বিদেশি ক্রেতাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোরও আহ্বান জানান। তার ভাষ্য, “একসময় বিভিন্ন দেশের ক্রেতারা বাংলাদেশের চামড়ার বাজারে সক্রিয় ছিলেন। এখন প্রায় পুরো শিল্পই চীনা বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা উদ্বেগজনক।”
কুষ্টিয়া শহরের মমতাজুল উলুম মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ শরিফুল ইসলাম জানান, তারা বিভিন্ন বাড়ি থেকে বিনামূল্যে গরু ও ছাগলের চামড়া সংগ্রহ করেছেন। পরে গরুর চামড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং ছাগলের চামড়া ৫০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করেছেন।
চামড়া মোকামের শ্রমিক মোজাম্মেল হক বলেন, “আমদানি কম, দামও কম। তার ওপর ল্যাম্পি রোগের কারণে আড়তগুলো খুব সতর্কতার সাথে চামড়া কিনছে।”
এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আল মামুন হোসেন মণ্ডল বলেন, “শুনেছি এবার চামড়ার ব্যবসা কিছুটা মন্দা যাচ্ছে। তবে অনেক আড়তদার ল্যাম্পি রোগের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সাধারণ মানুষ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কম দামে চামড়া কিনছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এটি অনেক ক্ষেত্রে কৌশল হতে পারে।”
তিনি জানান, চামড়া বাণিজ্যের ওপর প্রাণিসম্পদ বিভাগের সরাসরি নজরদারির সুযোগ নেই।
এদিকে কুষ্টিয়া বিসিকের ভারপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আশানুজ্জামান বলেন, “চামড়া সংরক্ষণের জন্য জেলায় পর্যাপ্ত লবণের মজুত রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী ইতোমধ্যে লবণ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।”
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার কুষ্টিয়ায় প্রায় দুই লাখ পশু কোরবানি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, কোরবানির প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় কম হতে পারে। তাদের মতে, পশুর সংখ্যা বেশি হলে চামড়ার আমদানিতেও তার প্রতিফলন দেখা যেত।



