সরকারিভাবে বোরো ধান সংগ্রহ অভিযানে তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকে টন প্রতি দুই হাজার টাকা করে কমিশন নেয়া হচ্ছে। এই কমিশন দিলে মান যাচাই ছাড়াই ধান নিয়ে ক্রয়মূল্য পরিশোধ করা হয়। আর না দিলে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। এমন ঘটনা ঘটেছে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলা খাদ্য গুদামে।
জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সৈয়দপুরে ৮২৬ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হবে। এজন্য কৃষক অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন করা ৭৯৮ জন কৃষকের মধ্যে লটারির মাধ্যমে ৪১৪ জনকে তালিকাভুক্ত করা হয়। সে অনুযায়ী প্রতিজন কৃষক দুই মেট্রিক টন করে ধান বিক্রি করতে পারবেন। প্রতি মন ধান এক হাজার ৪৪০ টাকা দরে ৭২ হাজার টাকা করে ধানের দাম পাবেন। ইতোমধ্যে ৬০৪ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে।
ধানের সঠিক মান নিশ্চিত হতে আদ্রতা সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এরচেয়ে বেশি আদ্রতা সম্পন্ন ধান নেয়া যাবে না বলে সরকারি নির্দেশনা আছে। এই বিষয়টিকে পুঁজি করেই মূলত কমিশন আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগে জানা গেছে। তাছাড়া প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে পাইকার, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন সুবিধাভোগীদের ধান বিক্রি করার সুযোগ দেয়ার অজুহাতেও নেয়া হচ্ছে কমিশন।
আসাদুজ্জামান লাবু নামে এক কৃষক বলেন, ‘এবার এলএসডিতে ধান দিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছি। টন প্রতি এক থেকে দুই হাজার টাকা কমিশন দিতে হচ্ছে উপজেলা খাদ্য গুদামের (এলএসডি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অনিমেষ কুমার সরকারকে। ধানের আদ্রতা বেশি বলে এই টাকা নিচ্ছেন। টাকা দিলে তখন আর আদ্রতা দেখছেন না। তাছাড়া খাদ্য গুদামের মধ্যেই ধান শুকিয়ে নেয়ার জন্য ফ্যান চালানোর বিদ্যুৎ বিল বাবদ আরো ২০০ টাকা করে নিচ্ছেন প্রতি টনে। আমার নিজের ও বোনেরসহ মোট ছয় মেট্রিক টন ধান বিক্রি বাবদ মোট নয় হাজার টাকা দিতে হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সবার কাছ থেকেই এই কমিশন আদায় করা হচ্ছে। এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজে, দারোয়ান মাজেদুল ও কয়েকজন পাইকারের মাধ্যমে এই টাকা নিচ্ছেন। আমি কাজী মোশাররফের মাধ্যমে দিয়েছি। এভাবে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে মানহীন ধানও কিনছেন। বিশেষ করে পাইকাররা লটারিতে নাম থাকা কৃষকদের কাছ থেকে ধান নিয়ে নিজেরা এলএসডিতে বিক্রি করে সুবিধা নিতে এই কমিশন জিইয়ে রেখেছে। অথচ প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন।’
মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আদ্রতা বেশি থাকার অজুহাতে এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অনিমেষ কুমার আমার ধান আটকে দেয়ায় বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হওয়ার উপক্রম। অথচ অনেকের আদ্রতা আমার চেয়েও বেশি হলেও শুধু কমিশন দেয়ায় পার করে দেয়া হয়েছে। কয়েকজন চিহ্নিত পাইকার কমিশন দিয়ে সুবিধা নিয়েছেন। তাদের ক্ষেত্রে নিয়মের তোয়াক্কা করা হয়নি। এমনকি তাদেরকে খাদ্য গুদাম চত্বরে ইলেকট্রিক ফ্যান দিয়ে ধান শুকনোর ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে।’
একটা সূত্রের অভিযোগ, তালিকায় স্থান পাওয়া অধিকাংশই প্রকৃত কৃষক নন। খাদ্য গুদামের সাথে সম্পৃক্ত পাইকাররাই নিজেদের লোকজনকে দিয়ে কৃষক অ্যাপসের মাধ্যমে আবেদন করিয়েছে এবং লটারিতে তাদেরই প্রাধান্য দেখা গেছে। এমনকি মৃত ব্যক্তির নামও তালিকায় আছে। অনেক রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন পেশার লোকজনও একইভাবে সুযোগ নিয়েছেন। আর এটাকেও পুঁজি করে অবলিলায় কমিশন বাণিজ্য চালাচ্ছেন এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অমিনেষ।
সোমবার (২৯ জুন) দুপুরে সৈয়দপুর উপজেলা খাদ্য গুদামে গেলে অনিমেষ কুমার বলেন, ‘পারতপক্ষে কৃষকদের যেন কোনো ভোগান্তি না হয় সেজন্য আদ্রতা কিছুটা বেশি নিয়ে আসলেও এখানেই বৈদ্যুতিক পাখা দিয়ে শুকিয়ে মানে এনে ধান নেয়া হচ্ছে।’
এক্ষেত্রে কমিশন আদায় করার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘কেউ অভিযোগ করতেই পারে কিন্তু আমার সামনে বলতে পারবেন না।’
তিনি আরো বলেন, ‘পাইকার বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সুবিধা দেয়ার কোনো বিষয় নেই। বরং কৃষকরাই তাদের কাছে গিয়ে ধান দিচ্ছেন। তাই তারা আমাদের কাছে বিক্রি করছেন। এখানে কোন অনিয়ম করা হচ্ছে না। আমরা ধান কিনতে না পারলে সমস্যায় পড়বো। সৈয়দপুরের বরাদ্দ কেটে নিয়ে অন্যখানে দেয়া হবে। তাই প্রকৃত কৃষক কিনা তা আমাদের ধর্তব্য নয়, বরং ধান পাওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে যারাই সহযোগিতা করেন তাদের কাছ থেকেই ধান নেয়া হবে। তবে প্রসেস ঠিক রাখা হয়েছে।’
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সোহেল আহমেদ বলেন, ‘কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহে ধানের মান নিশ্চিত হওয়াটা সবচেয়ে জরুরি। যদিও বরাদ্দপ্রাপ্ত ধান সম্পূর্ণ কেনাটাও প্রয়োজন। কিন্তু মানের ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই কোন কিছুর বিনিময়েই ১৪ শতাংশের বেশি আদ্রতা সম্পন্ন ধান নেয়ার প্রশ্নই আসে না। তবুও যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায় তাহলে তা খতিয়ে দেখা হবে। আমরা সর্বোতভাবেই চেষ্টা করছি তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকেই ধান কেনার।‘



