চেয়ারম্যান পলাতক, প্যানেল চেয়ারম্যান কারাগারে; ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

জন্মনিবন্ধন বা প্রত্যয়নপত্র সব দিক থেকে প্রস্তুত থাকলেও চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরের জন্য সেবাগ্রহীতাদের দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে (ইউডিসি) দায়িত্বরত ব্যক্তিরা জানান, স্বাক্ষর না পাওয়া পর্যন্ত কাগজপত্র হস্তান্তর করা সম্ভব নয়।

জসিম উদ্দিন, খানসামা (দিনাজপুর)

Location :

Khansama
৩ নম্বর আঙ্গারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ
৩ নম্বর আঙ্গারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ |নয়া দিগন্ত

দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার ৩ নম্বর আঙ্গারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদে জনসেবার চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। প্রায় তিন সপ্তাহ থেকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পলাতক এবং প্যানেল চেয়ারম্যান কারাগারে থাকায় পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে জন্মনিবন্ধন, প্রত্যয়নপত্র, ওয়ারিশ সনদ, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা ও ভূমি সংক্রান্ত সেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৩ নম্বর আঙ্গারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান মোস্তফা আহম্মেদ শাহ্ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন এবং নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত হন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর স্থানীয় এক যুবদল নেতার করা নাশকতা মামলার আসামি হওয়ায় গ্রেফতার আতঙ্কে তিনি বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। চেয়ারম্যান পলাতক থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, তিনি অজ্ঞাত স্থান থেকে সীল ও স্বাক্ষরের মাধ্যমে অফিস পরিচালনার চেষ্টা করছেন। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

সরেজমিনে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, কোনো জন্মনিবন্ধন বা প্রত্যয়নপত্র সব দিক থেকে প্রস্তুত থাকলেও চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরের জন্য সেবাগ্রহীতাদের দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে (ইউডিসি) দায়িত্বরত ব্যক্তিরা জানান, স্বাক্ষর না পাওয়া পর্যন্ত কাগজপত্র হস্তান্তর করা সম্ভব নয়।

এদিকে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যানের গ্রেফতার। জানা গেছে, ১ নম্বর প্যানেল চেয়ারম্যানকে সম্প্রতি একটি অজ্ঞাতনামা মামলার আসামি হিসেবে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ফলে চেয়ারম্যান ও প্যানেল চেয়ারম্যান—উভয়ই দায়িত্ব পালনে অক্ষম থাকায় ইউনিয়ন পরিষদ পুরোপুরি নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউনিয়ন পরিষদের একাধিক সদস্য জানান, চেয়ারম্যান ও প্যানেল চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে পরিষদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরিষদের সদস্যরা সেবাগ্রহীতাদের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বা কার্যকর সমাধানের আশ্বাস দিতে পারছেন না। একইভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

সুমনা আক্তার নামে ভুক্তভোগী এক সেবাগ্রহীতা বলেন, ‘সব কাগজপত্র ঠিক থাকলেও শুধু স্বাক্ষরের জন্যই দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। চেয়ারম্যান নেই, প্যানেল চেয়ারম্যানও জেলে—আমরা যাবো কোথায়?’

স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলেছেন, চেয়ারম্যান পলাতক এবং প্যানেল চেয়ারম্যান কারাগারে থাকলে ইউনিয়ন পরিষদের সেবা কেন বন্ধ থাকবে? জনগণের সেবা নিশ্চিতে প্রশাসন কেন এখনো বিকল্প দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক বা স্বাক্ষরকারী নিয়োগ দিচ্ছে না?

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সচিব বলেন, ‘চেয়ারম্যান পরিষদে উপস্থিত না থাকলেও তিনি আমাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর করছেন। তবে তিনি সরাসরি না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আমি একজন ছোট্ট কর্মচারী, চেয়ারম্যানের বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) স্যারের সাথে কথা বললে ভালো হবে, কারণ চেয়ারম্যানদের বিষয়টি মূলত তিনিই দেখভাল করেন।’

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুজ্জামান সরকার বলেন, ‘জনগণের সেবা প্রদান ব্যাহত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিটি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং বিষয়টি প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।’