‘তারা ভরা রাতে তোমার কথা যে মনে পড়ে বেদনায়’, ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা, রূপের জাদু এনেছি’, ‘মনরে এই ভবের নাট্যশালায়, মানুষ চেনা দায়’—বাংলা গান ও সাহিত্যের ভুবনে অমর হয়ে থাকা এসব কালজয়ী সৃষ্টির রচয়িতা একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি ও গীতিকার আজিজুর রহমান। কুষ্টিয়ার হাটশ হরিপুরের এই কৃতী সন্তান শুধু কবি বা গীতিকারই ছিলেন না, ছিলেন সাহিত্যিক, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, সংগঠক ও জনপ্রতিনিধি।
আজ ১২ সেপ্টেম্বর কবি আজিজুর রহমানের ৪৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে গ্যাংগ্রিন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বরেন্য এ কবি। কিন্তু মৃত্যুর প্রায় অর্ধশত বছর পরও তার স্মৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ঘাটতি রয়ে গেছে। অবহেলা আর অযত্নে পড়ে আছে তার জন্মভিটা ও সমাধিস্থল। হারিয়ে যেতে বসেছে একুশে পদকপ্রাপ্ত এই গুণী মানুষের স্মৃতিচিহ্ন।
১৯১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার গড়াই নদীর তীরের হাটশ হরিপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন আজিজুর রহমান। তার বাবা বশির উদ্দিন প্রামাণিক এবং মা সবুরুন নেছা। মাত্র ১০-১২ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। পারিবারিক সহায়-সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেও জ্ঞানার্জনের অদম্য আকাংখা তাকে থামাতে পারেনি। বিভিন্ন বিষয়ের বই নিজে পড়ে তিনি হয়ে ওঠেন স্বশিক্ষিত এক বিদগ্ধ মানুষ।
১৯৩৮ সাল থেকে সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন তিনি। তার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে সে সময়ের খ্যাতনামা সওগাত, মোহাম্মদী, আজাদ, নবশক্তি, আনন্দবাজার, ভারতবর্ষ, বুলবুল ও শনিবারের চিঠিসহ বিভিন্ন পত্রিকায়। ১৯৫৪ সালে নিজস্ব শিল্পী হিসেবে যোগ দেন ঢাকা বেতারে।
সাংবাদিক হিসেবেও ছিল তার পরিচিতি। অধুনালুপ্ত দৈনিক পয়গম পত্রিকার সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক হিসেবে ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত কিশোর মাসিক ‘আলপনী’রও সম্পাদক ছিলেন তিনি। সাহিত্য ও সংগীতচর্চার পাশাপাশি সমাজ সেবাতেও ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
১৯৩৪ সালে নিজের দাদা চাঁদ প্রামাণিকের নামে হরিপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘চাঁদ স্মৃতি পাঠাগার’। একসময় দূর-দূরান্তের মানুষও বই পড়তে ও সংগ্রহ করতে এ পাঠাগারে আসতেন। সংগঠক হিসেবেও তার ছিল অসাধারণ দক্ষতা।
আজিজুর রহমানের সৃষ্টির পরিধিও ছিল বিস্ময়কর। তিনি প্রায় তিন হাজারের বেশি গান এবং তিনশ’রও বেশি কবিতা রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘তোমার নামে তসবিহ খোদা, লুকিয়ে যেন রাখি’, ‘পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা, আমার এ দেশ ভাইরে’, ‘রক্ত রঙিন উজ্জ্বল দিন, বৃক্ষ শিখায় জ্বলছে’, ‘তারা ভরা রাতে তোমার কথা যে, মনে পড়ে বেদনায়’, ‘মনরে এই ভবের নাট্যশালায়, মানুষ চেনা দায়’, ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা, রূপের জাদু এনেছি’, ‘এই সুন্দর পৃথিবীতে, আমি এসেছিনু কিছু নিতে’, ‘এই রাত বলে ওগো তুমি আমার, ওই চাঁদ বলে ওগে তুমি আমার’ এবং ‘এই রাজধানীর বুকে, কত জীবনের আশা ভেঙে যায়’।
তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ডাইনোসরের রাজ্যে’ (১৯৬২), ‘জীবজন্তুর কথা’ (১৯৬২) ও ‘ছুটির দিনে’ (১৯৬৩)। অনুবাদ গ্রন্থের মধ্যেও রয়েছে ‘এই দেশ’ ও ‘আবহাওয়ার পয়লা কেতাব’।
জীবনের শেষ সময়টা অবশ্য ছিল বেদনা ও সঙ্কটে ভরা। নানা দুশ্চিন্তা, আর্থিক অনটন ও রোগব্যাধিতে জর্জরিত ছিলেন তিনি। অর্থাভাবে চিকিৎসাও ঠিকমতো করাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত গ্যাংগ্রিং এ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৭৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর না ফেরার দেশে চলে যান এই গুণী মানুষটি।
কবির মৃত্যুর ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও তার জন্মভিটা ও সমাধিস্থলের অবস্থা হতাশাজনক। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর ইউনিয়নের বাজারের পাশে রয়েছে তার সমাধিস্থল। স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সমাধিস্থলসহ স্মৃতিচিহ্নগুলো ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। হাটশ হরিপুরে প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে থাকা কবির বাস্তুভিটায় বর্তমানে তার দুই ভাইয়ের সন্তান এবং কবির বড় ছেলে মরহুম ফজলুর রহমানের ছেলে আশফাকুর রহমান লিটনসহ পরিবারের সদস্যরা বসবাস করছেন।
কবির স্মৃতি ধরে রাখতে তার বাস্তুভিটায় সরকারি উদ্যোগে অডিটোরিয়াম, লাইব্রেরি ও মিউজিয়াম নির্মাণের কথা ছিল। এমনকি মাজার নির্মাণের জন্য ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর আর দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। কবির নাতি আশফাকুর রহমান লিটনের কণ্ঠে তাই ক্ষোভ ও হতাশা।
তার ভাষ্য, কবির স্মৃতি রক্ষায় অ্যাকাডেমি ও মিউজিয়াম নির্মাণসহ নানা সরকারি উদ্যোগের কথা বলা হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীও রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয় না।
লেখক ও গবেষক এবং সম্মিলিত সামাজিক জোটের চেয়ারম্যান ড. আমানুর আমান বলেন, ‘কবি আজিজুর রহমান ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও জনপ্রতিনিধি। তার সাহিত্য ও সংগীতকর্মের যথাযথ মূল্যায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার অবদান তুলে ধরার দায়িত্ব সবার।’
কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজানুর রহমান জানান, কোনো দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যাপনের জন্য সরকারি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি জানিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হবে।
কালজয়ী সৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছেন স্রষ্টা আজিজুর রহমানের গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তার লেখা গানের সুরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আবেগ, প্রেম, দেশ, জীবন ও মানবিকতার নানা অনুভূতি খুঁজে নেয়। অথচ সেই গানের স্রষ্টার জন্মভিটা ও সমাধিস্থলই আজ সংরক্ষণের অপেক্ষায়।
একুশে পদকের মতো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতে সম্মানিত এই কবির জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণার যেমন বিশাল সুযোগ রয়েছে, তেমনি তার জন্মস্থানকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে একটি সম্ভাবনাময় সাহিত্য-সংস্কৃতি ও পর্যটনকেন্দ্র। তবে তার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। নইলে সময়ের স্রোতে শুধু তার স্মৃতিচিহ্নই নয়, কুষ্টিয়ার মাটিতে জন্ম নেয়া এই কালজয়ী স্রষ্টার সাথে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও হারিয়ে যেতে পারে।



