কাউয়াদিঘি হাওরপাড়ে বছরে দেড় কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদন

মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘি হাওরপাড়ের মৎস্যজীবীরা দেশীয় পদ্ধতিতে শুঁটকি মাছ উৎপাদন করে বছরে দেড় কোটি টাকা আয় করেন।

আব্দুল আজিজ, মৌলভীবাজার

Location :

Maulvibazar
রোদে মাছ শুকানো হচ্ছে
রোদে মাছ শুকানো হচ্ছে |নয়া দিগন্ত

মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘি হাওরপাড়ের মৎস্যজীবীরা দেশীয় পদ্ধতিতে শুঁটকি মাছ উৎপাদন করে বছরে দেড় কোটি টাকা আয় করেন। জেলার রাজনগরের হাওরপাড়ের সোনাপুর, ইসলামপুর, অন্তেহরি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বাঁশের মাচাঁর ওপর শুঁটকি শুকানো হচ্ছে।

প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর এই শিল্প স্থানীয়দের জীবিকা যেমন নিশ্চিত করছে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

হাওর এলাকার বিস্তীর্ণ জলরাশি থেকে শুষ্ক মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আহরণ করা হয়। এরমধ্যে টেংরা, পুঁটি, চিংড়ি ও ছোট আকারের দেশীয় মাছ শুঁটকি তৈরির জন্য বেশি ব্যবহৃত হয়।

একযুগের বেশি সময় ধরে বাঁশের মাচা পদ্ধতিতে মাছ শুকিয়ে এই শুঁটকি উৎপাদন করে আসছেন স্থানীয় ও বাইরের একদল ব্যবসায়ী।

সংগ্রহ করা মাছগুলো প্রথমে পরিষ্কার করে লবণ মিশিয়ে খোলা রোদে শুকানো হয়। কয়েকদিনের প্রক্রিয়া শেষে তৈরি হয় শুঁটকি, যা স্থানীয় বাজার ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিদেশে সরবরাহ করা হয়।

স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি মৌসুমে একজন জেলে গড়ে ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকার শুঁটকি উৎপাদন করতে সক্ষম হন। হাওরপাড়ের শতাধিক পরিবার সরাসরি এই কাজে জড়িত। ফলে পুরো এলাকায় বছরে দেড় কোটি টাকার বেশি শুঁটকি উৎপাদন হয় বলে জানান তারা।

কাউয়াদিঘি হাওরপাড়ের মৎস্যজীবীরাই এ পেশার সাথে বেশি জড়িত রয়েছেন।

হাওরপাড়ের সোনালোহা বিলের মৎস্যজীবী তিতু মিয়া বলেন, ‘কার্তিক মাস থেকে মাছ ধরি, আর চৈত্রমাস পর্যন্ত সেগুলো শুকিয়ে শুঁটকি বানাই। এতে আমাদের সারা বছরের আয়ের বড় একটা অংশ আসে।’

হাওরপাড়ের সোনাপুর গ্রামের মৎস্যজীবী আবু বক্কর বলেন, ‘এই শিল্পে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে মাছ শুকাতে সমস্যা হয়। এছাড়া সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় উৎপাদিত শুঁটকি নষ্ট হয়ে যায়।’

বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে জেলেদের।

কাওয়াদিঘি পাড়ের সোনাপুর শুঁটকি উৎপাদনের একটি পল্লীতেই বছরে দেড় কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদন হয় বলে জানিয়েছেন ওই পল্লীর মালিক হাদিস আহমদ।

তিনি বলেন, ‘আমার এই পল্লীতে নারীসহ ৪০ কর্মচারী কাজ করেন। আমার ঘাটে হাওর থেকে মাছ আহরণকারীরা মাছ এনে দেন। আমরা কার্তিক মাস থেকে শুরু করে চৈত্র মাস পর্যন্ত শুঁটকি উৎপাদন করি। ১০ থেকে ১২ বছর ধরে এখানে ভালো মানের শুঁটকি উৎপাদন করে আসছি।’

হাদিস আহমদ আরো বলেন, ‘প্রতি বছর ২৫ হাজার কেজি শুঁটকি উৎপাদন করা হয়। আমরা প্রতি মৌসুমে ময়মনসিংহ থেকে এখানে এসে অবস্থান করি। ময়মনসিংহের হাট-বাজারে এই শুটকির চাহিদা বেশি থাকায় ভালো দামে বিক্রি করা যায়। প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়। মৌসুমে দেড় কোটি টাকার বেশি শুঁটকি উৎপাদন হয়ে থাকে।’

রাজনগর উপজেলা মৎস্য অধিদফতরের কর্মকর্তা এ কে এম মহসীন বলেন, ‘বাণিজ্যিকভাবে এখানে শুঁটকি উৎপাদনের বিষয়টি আমাদের জানা নেই। তবে খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, বিচ্ছিন্নভাবে হাওরপাড়ের মৎস্যজীবীরা শুঁটকি উৎপাদন করেন। তাদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার সুযোগ দেয়া হলে শুঁটকি উৎপাদনের পরিমাণ ও মান আরো বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি রফতানির সুযোগ তৈরি হলে এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও সম্ভব হবে।’

বিশিষ্টজনরা মনে করেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ, সরকারি সহায়তা এবং বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গেলে কাউয়াদিঘি হাওরপাড়ের শুঁটকি শিল্প দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে।