কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী উপজেলা রৌমারী। একদিকে ব্রহ্মপুত্র নদ, অন্যদিকে ভারতের আসাম রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা বিস্তীর্ণ এলাকা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের চোরাচালানের ঝুঁকিতে রয়েছে এ জনপদ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তের দুর্গম ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকাকে ব্যবহার করে এখন মাদক পাচারকারীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ছে ভারতীয় মদ, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য।
স্থানীয় সূত্র ও এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। হাট-বাজার থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামেও মাদক কেনাবেচার ছোট ছোট আস্তানা গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে উঠতি বয়সী যুবসমাজ।
রৌমারী উপজেলার আয়তন প্রায় ৯৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকা ভারতের সীমান্তঘেঁষা। সাহেবের আলগা এলাকার ১০৪৭ নম্বর সীমান্ত পিলার থেকে বালিয়ামারী ১০৭৯ নম্বর সীমান্ত পিলার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকার বড় একটি অংশ দুর্গম ও যোগাযোগব্যবস্থায় পিছিয়ে রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্ত সড়কের অভাবে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির সদস্যদের নিয়মিত টহল ও নজরদারিতে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়।
এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চোরাকারবারিরা রাতের আঁধারে কিংবা সুযোগ বুঝে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মাদক পাচারের চেষ্টা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। সীমান্ত পেরিয়ে আসা মাদকের চালান স্থানীয় পর্যায়ের কারবারিদের মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রাম ও বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
গ্রাম-গঞ্জে মাদকের বিস্তার
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাদকের বিস্তার এখন আর শুধু সীমান্তবর্তী এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামেও মাদক পৌঁছে যাচ্ছে। কোথাও গোপনে, আবার কোথাও পরিচিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চলছে কেনাবেচা।
বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের অভাব এবং সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে কিছু উঠতি বয়সী যুবক মাদক সেবনের পাশাপাশি মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে পরিবারে অশান্তি, সামাজিক অবক্ষয়, চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন
মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময় মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও জড়িত ব্যক্তিদের আটক করলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে নিয়মিত ও দৃশ্যমান অভিযান আরো জোরদার করা প্রয়োজন।
তবে এ বিষয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঁকি দেয়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা—পুলিশ, বিজিবি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সমন্বিত অভিযান আরো বাড়ানো হোক।
পুলিশের অপেক্ষায় না থেকে মাঠে এলাকাবাসী
মাদকের বিস্তার ঠেকাতে ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় যুবসমাজ ও সচেতন নাগরিকরা নিজেদের উদ্যোগে মাদকবিরোধী কর্মসূচি শুরু করেছেন। কোথাও মাদকসেবী ও কারবারিদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হচ্ছে, আবার কোথাও অভিযুক্তদের ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
এরই মধ্যে গতকাল ২২ আগস্ট শনিবার রাতে বারবান্দা এলাকায় যুবসমাজের উদ্যোগে একটি মাদকবিরোধী অভিযানে এক মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে ৯১ বোতল ভারতীয় মদ (অফিসার্স চয়েস) উদ্ধার করেছে যুবসমাজ।
পরে উদ্ধার করা মদ বড়াইবাড়ী বিজিবি বিওপির সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় এলাকার যুবসমাজের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এলাকাবাসীর দাবি, সীমান্তবর্তী রৌমারীতে মাদক পাচার ও বিস্তার ঠেকাতে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। সীমান্তে নিয়মিত টহল বাড়ানো, দুর্গম সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা, সন্দেহজনক চলাচলের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি—সবকিছু একসাথে বাস্তবায়ন করতে হবে।
মাদকমুক্ত রৌমারীর দাবি
এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো: রুহুল আমিন বলেন, ‘সীমান্তের দুর্গমতা যেন কোনোভাবেই মাদক পাচারকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে না পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় যুবসমাজকে একযোগে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’
কারণ মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না—একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হলে রৌমারীর প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে মাদকের বিস্তার আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কা স্থানীয় সচেতন মহলের।



