মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরকে ঘিরে জমতে শুরু করেছে সিলেট নগরীর ঈদ বাজার। ঈদকে সামনে রেখে সিলেটের শপিংমল ও বিপনি বিতানে আকর্ষণীয় ও রুচিশীল পোশাকের সম্ভার নিয়ে ক্রেতাদের দৃশ্য আকর্ষণ করার চেষ্টা করছেন ব্যবসায়িরা।
ঈদের সময় ঘনিয়ে আসায় শপিংমলগুলোতে ভিড় বেড়েছে ক্রেতাদের। তবে পুরোপুরি ঈদ বাজার জমতে আরো দু’চার দিন লাগবে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
পোশাক ডিজাইনাররা বলছেন, ফ্যাশন জগৎ প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। মানুষের রুচি, পছন্দ ও জীবনধারা পরিবর্তিত হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।
এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে দেশের ঐতিহ্য, ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা, আবহাওয়া ও ঋতুভিত্তিক চাহিদা এবং স্বাচ্ছন্দ্য গুরুত্ব দিয়েই এবারের ঈদে পোশাক ডিজাইন করেছেন তারা।
বিক্রেতারা বলছেন, ঈদের আরো ১৫ থেকে ১৬ দিন বাকি থাকলেও ১০ রমজানের পর থেকেই ক্রেতা বাড়তে শুরু করেছে ঈদ বাজারে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার নিখুঁত সমন্বয়ে গড়া নতুন কালেকশন রেখেছেন ব্যবসায়ীরা।
উচ্চবিত্তরা ব্র্যান্ডের শো-রুমে ছুটলেও নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা ছুটছেন মধ্যম মানের শপিংমল ও ফুটপাতে। সিলেটের উচ্চবিত্ত শ্রেণির গ্রাহকেরা মূলত নগরের নয়াসড়ক ও কুমারপাড়া এলাকার ব্র্যান্ডের শো-রুমে শপিং করে থাকেন।
এসব এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিক্রেতারা ব্যস্ত সময় পার করছেন। এসব এলাকার পোশাকের শো-রুমগুলোতে দেখা যাচ্ছে ক্রেতাদের ভিড়। দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় থাকে।
বুধবার দুপুরে জেল রোডের আড়ংয়ে শপিং করতে আসা জান্নাতুল মাওয়া সায়মা বলেন, ‘এ সময়ে শপিং করলে কিছুটা রিলাক্সে করা যায়। কালেকশনও পর্যাপ্ত পাওয়া যায়। এজন্য শপিং করতে এসেছি। মোটামুটি শপিং ৫০ শতাংশ কমপ্লিট। বাকিটা দু’একদিনের মধ্যে সেরে ফেলবো।’
আড়ংয়ের বিক্রয় কর্মী সাদিয়া আফরিন বলেন, ‘ঈদের সর্বোচ্চ কালেকশন রয়েছে তাদের আউটলেটে। ক্রেতারা ঈদের শপিং করতে শুরু করেছেন।’
ছোটদের ঈদের পোশাকের বেবি শপের বিক্রয়কর্মী কামরুন্নাহার জানান, এবার ঈদ কালেকশনে ছোটদের পোশাকে আনা হয়েছে নতুনত্ব। এবারের মূল লক্ষ্য বাহারি সব আরামদায়ক পোশাক। প্যাটার্ন ও মোটিফের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে ব্লক প্রিন্ট, ফুলেল নকশার সঙ্গে কিছু কার্টুন থিমের প্রিন্ট। সব মিলিয়ে শিশুর আরামের পাশাপাশি উৎসবের আমেজও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বিক্রেতারা জানান, ছেলেশিশুর পোশাকে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে পাঞ্জাবি ও ফতুয়া। এসব পোশাকে এবার ব্যবহার হচ্ছে জ্যামিতিক প্রিন্ট, চেক, স্ট্রাইপ, ফুলেল ব্লক প্রিন্ট ও ঐতিহ্যবাহী মোটিফ। কলার, কাফ ও বুকে কনট্রাস্ট পাইপিং বা সূচিকর্মের কাজ যুক্ত করে নতুনত্ব আনা হয়েছে। সেইসাথে কাঠের বোতাম, হ্যান্ডমেইড টার্সেল কিংবা ছোট্ট এমব্রয়ডারি প্যাঁচ পোশাককে করে তুলছে আকর্ষণীয়। অনেক পাঞ্জাবিতে দেখা যাচ্ছে ডিজিটাল প্রিন্টের ব্যবহার, যেখানে হালকা রঙের ওপর সূক্ষ্ম নকশা ফুটে উঠছে। আবার অ্যাসিমেট্রিক কাট কিংবা শর্ট লেংথ ফতুয়ার চল বেড়েছে। পাশাপাশি ম্যাচিং জ্যাকেট বা ওয়েস্টকোট যুক্ত করে তৈরি হচ্ছে ফিউশন স্টাইল।
মেয়ে শিশুর ঈদের পোশাকের বৈচিত্র্য আরো বিস্তৃত। দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোয় মিলছে মেয়েদের বাহারি কাটছাঁটের পোশাক। ফ্রকের সাথে সারারা, গাউন, লেহেঙ্গা কিংবা সালোয়ার-কামিজে ফুলেল নকশা এখন শীর্ষে। টিউলিপ, গোলাপ, সূর্যমুখী কিংবা ছোট ছোট বুনো ফুলের প্রিন্ট শিশুর পোশাকে এনে দিচ্ছে প্রাণচাঞ্চল্য। এ ছাড়া পোলকা ডট, টাই-ডাই, অ্যাবস্ট্রাক্ট প্রিন্ট, কার্টুন মোটিফ ও রূপকথা-প্রেরিত ডিজাইনও বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করছে।
সুতি ছাড়াও মিলছে সিল্ক, লিনেন, ভিসকস, মসলিন কাপড়ের পোশাক। লেইস, নেট ও অরগাঞ্জা কাপড়ে লেয়ারিং প্যাটার্ন ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে ঘেরওয়ালা ফ্রক, নায়রা কাট, কটি ফ্রক। যা শিশুর সাজে যোগ করছে রাজকীয়তা। এ ছাড়া লেহেঙ্গার আদলে রেডিমেইড শাড়িও বেশ নজর কাড়ছে।
ঐতিহ্যবাহী নকশার ব্যবহারও এবার লক্ষণীয়। জামদানি-অনুপ্রাণিত বুটিক কাজ, নকশিকাঁথার স্টিচ, আয়নাযুক্ত সুতার কারুকাজ ছোটদের পোশাকে যুক্ত হচ্ছে আধুনিকভাবে। বিশেষ করে হাতের কাজের সূক্ষ্ম অলংকরণ পোশাককে করে তুলছে উৎসব উপযোগী। অনেক ডিজাইনে দেখা যাচ্ছে বর্ডার ও হেমলাইনে আলাদা বা কন্ট্রাস্ট রং ও নকশার ব্যবহার। যা পুরো পোশাককে এনে দিচ্ছে ভারসাম্যপূর্ণ সৌন্দর্য। রঙের ক্ষেত্রে এবার কোমল, স্নিগ্ধ টোনগুলো বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে যেমন– সাদা, হলুদ, আইস ব্লু, ব্লু, প্যাস্টেল, মিন্ট, সি গ্রিন, মভপিংক, বেবি পিংক ইত্যাদি।
নয়াসড়ক ও কুমারপাড়া ছাড়াও নগরীর আল হামরা শপিং সিটি, সিটি সেন্টার, ব্লু ওয়াটার শপিং মল, সিলেট মিলিনিয়াম, লতিফ সেন্টার ও শুকরিয়া মার্কেটের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গ্রাহকের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এসব শপিং মলে নগরের বড় একটি অংশের মানুষ শপিং করে থাকেন। সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নানা বয়সী মানুষ কেনাকাটা করতে এসেছেন।
ক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ এবার ঈদের কেনাকাটায় মূলত সন্তানদের পোশাকের গুণমানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
আল হামরা শপিং সিটিতে কেনাকাটা করতে আসা সরকারি কর্মকর্তা বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘দুই ছেলের জন্য পাঞ্জাবি, পায়জামা, ফতোয়া ও জুতা কিনেছি। পরিবারের বাকিদের কেনাকাটা এখনও হয়নি।’
শপিং মলের বাইরে লালদিঘি হকার্স মার্কেট ও হাসান মার্কেটের দোকানগুলোতেও ভিড় করছেন এক শ্রেণির গ্রাহক। বাচ্চাদের পছন্দের পোশাক কিনতে তারা শপিংমলগুলোতে ছুটলেও নিজেদের প্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য বেছে নিচ্ছেন ফুটপাত।
হকার্স মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা সাদিক-ফাবেহা দম্পতি সন্তানদের জন্য মার্কেটের ভেতর থেকে কেনাকাটা করলেও নিজেদের জন্য তারা ফুটপাতের দোকানে পণ্য খুঁজছেন।
সাদিক বলেন, ‘পোশাকের দাম এবার অনেক বেশি। দুই সন্তানের জন্য তিন হাজার টাকা বাজেট থাকলেও খরচ হয়ে গেছে পাঁচ হাজার টাকারও বেশি। তাই এখন স্ত্রীর থ্রি-পিস আর নিজের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সাধ্যের মধ্যে ফুটপাত থেকেই কেনার চেষ্টা করছি।’
শো-রুম ফেইথ লাইফস্টাইলের ম্যানেজার মুহিব্বুল্লাহ জানান, ‘আমাদের শো-রুমে উন্নত মানের প্রিমিয়াম কোয়ালিটির চাহিদা বেশি। গত শুক্রবার থেকে ভালো বিক্রি শুরু হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, চাকরিজীবীরা বেতন পেতে আরো কয়েক দিন সময় লাগবে। মূলত বেতন ও বোনাস পাওয়ার পরই মার্কেটে তাদের ঢল নামবে। এখন মূলত ব্যবসায়ী ও অন্যান্য শ্রেণির ক্রেতারা আসছেন।
কয়েক দিন পর ভিড় ও বিক্রি দু’টোই কয়েক গুণ বাড়বে বলে ধারণা করছেন ব্যবসায়ীরা।



