মানিকগঞ্জের ঘিওরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল প্রায় তিনশ বছরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জামাই মেলা। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) উপজেলার পয়লা ইউনিয়নের বাঙ্গালা গ্রামবাসী ও স্থানীয় মুক্তা সংঘের উদ্যোগে স্থানীয় স্কুল মাঠে এ মেলার আয়োজন করা হয়।
প্রতিবছর দোল পূর্ণিমা উৎসব উপলক্ষে এ মেলার আয়োজন করা হয়। তবে পবিত্র রমজানের কারণে এবারের মেলা ঈদের তিন দিন পর মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়। এ মেলা স্থানীয়ভাবে বৌ মেলা, বাঙ্গালা মেলা বা মাছের মেলা নামেও পরিচিত।
মেলার ভিড় ঠেলে এক প্রবীণ ব্যক্তিকে ঘিরে ছয়জন নারীর একটি দল এগোচ্ছিল, তাদের দেখে সবার মধ্যে কৌতূহল দেখা দেয়। এ দলের পুরুষ সদস্যটি হলেন বাঙ্গালা গ্রামের অতি পরিচিত ও প্রবীণ জামাতা আবুল কাশেম (৭০)। তার সাথে ছিলেন স্ত্রী, তিন শ্যালিকা ও দুই শ্যালকের স্ত্রী। এ ছয় নারীর দল নিয়ে আবুল কাশেমের মেলায় উপস্থিতি ও কেনাকাটার দৃশ্যটা যেমনি রাজকীয়, তেমনি ছিল নজরকাড়া।
আবুল কাশেম মিয়া নিজেই হাসিমুখে জানালেন তার এ রাজকীয় যাত্রার রহস্য।
আবুল কাশেম মিয়া বলেন, ৫০ বছর আগে এ গ্রামের জামাই হয়েছিলাম। সেই যে শুরু, এরপর কখনো মেলায় আসা মিস হয়নি। আমাদের কাছে এ মেলা মানেই হচ্ছে জামাইদের বিশেষ রাজত্ব।
মেলার রীতি অনুযায়ী, আশপাশের গ্রামগুলো থেকে মেয়ে ও জামাইদের দাওয়াত করে আনা হয় এবং জামাইগণ মেলা থেকে বিশাল আকৃতির মাছ কিনে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যান। পাঁচ থেকে ২০ কেজি ওজনের বাঘাইর, আইড়, বোয়াল, কাতল, পাঙ্গাস ও চিতল মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন জেলেরা। এসব মাছ কেনার জন্য জামাইদের মধ্যে রীতি মতো প্রতিযোগিতা চলে। জামাইদের আপ্যায়নে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকেও দেয়া হয় গরু, মহিষ, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, আসবাবপত্র বা স্বর্ণালঙ্কারের মতো আকর্ষণীয় সব উপহার।
মেলার দ্বিতীয় দিনটি বৌ মেলা হিসেবে পরিচিত, যেখানে স্বামীর বাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসা মেয়েরা স্বামীদের নিয়ে ঘোরাঘুরি ও কেনাকাটা করেন।
মেলায় মাছ ছাড়াও আসবাবপত্র, বাঁশ-বেত সামগ্রী, মাটির তৈজসপত্র, বড় সাইজের মিষ্টি ও হস্তশিল্পের দোকানে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। বিনোদনের জন্য সার্কাস, নাগরদোলা ও ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
মেলায় মাছ গলিতে দেখা যায়, পাঁচ থেকে বিশ কেজি ওজনের মাছের সমারোহ। বিক্রেতারা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ডালায় সাজিয়ে রেখেছেন। বিক্রিও হচ্ছে ব্যাপক। এগুলোর মধ্যে আছে বিভিন্ন নদীর বাঘাইর, আইড়, বোয়াল, কাতল, পাঙ্গাস, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, চিতল ইত্যাদি প্রজাতির মাছ। ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের চাষের মাছও পর্যাপ্ত পাওয়া যায়।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ ঘোড়দৌড়ে অংশ নেয় অর্ধশত ঘোড়া। এছাড়া সাইকেল রেস, শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বয়স্ক ব্যক্তিদের দৌড় প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের দেয়া হয় আকর্ষণীয় পুরষ্কার।
মেলায় উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার তুলে দেন মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা, ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাশিতা-তুল ইসলাম ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: তানভীর ইসলাম।
স্থানীয় ডা: গণি-সাহেরা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দুলাল চন্দ্র সরকার বলেন, এটা কেবল একটি মেলা নয়, এর রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস ও হাজারো মানুষের মিলনমেলা। মেলায় থাকে বড় বড় মাছের বিশাল সংগ্রহ, সংসারের যাবতীয় উপকরণ, বিনোদনের জন্য সার্কাস, নাগরদোলা, গান ইত্যাদি।
মাটির তৈজসপত্রের বিক্রেতা দুলাল পাল বলেন, আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকে এ মেলায় মাটির জিনিস বিক্রি করতে আসি। বাবার মুখে শুনেছি আমার দাদাও এ মেলায় আসতেন।
সাবেক ইউপি সদস্য চাঁনমিয়া বলেন, আমার মেয়ের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর আগে। প্রতিবছর এ মেলায় মেয়ে ও জামাইকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসি, তাদের উপহার দিই। এবছর মেয়ের জামাইয়ের জন্য একটি গাভি উপহার দিয়েছি। সবাই যার যার সাধ্য মতো মেয়ে জামাইদের উপহার দিয়ে থাকেন। এটিই আমাদের ঐতিহ্য।
মেলা কমিটির সভাপতি মো: মিজানুর রহমান লেবু বলেন, এটি জেলার অন্যতম প্রাচীনতম মেলা। এলাকার মানুষ এ দিনটির জন্য সারা বছর মুখিয়ে থাকেন। ৩০০ বছরের এ ঐতিহ্য কেবল একটি মেলা নয়, বরং মেলাটি এ অঞ্চলের মানুষের সামাজিক মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন। পূর্ব পুরুষদের দীর্ঘদিনের এ রীতি ধরে রাখতে পেরে বাঙ্গালা গ্রামবাসী গর্বিত।



