অবৈধ বালি উত্তোলন ও স্তুপে হুমকিতে ২টি ব্রিজ

দুটো ব্রিজের নদীতে বাল্ক স্থাপনের করে লাখ লাখ সেফটি বালি উত্তোলন ও বালুর মহাল তৈরি এবং মুসাপুর রেগুলেটর পুনঃনির্মাণ না করার কারণে ব্রিজগুলো হুমকির মুখে পড়েছে এবং নদীতে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে।

সোনাগাজী (ফেনী) সংবাদদাতা

Location :

Feni
অবৈধভাবে বালু উত্তোলন
অবৈধভাবে বালু উত্তোলন |নয়া দিগন্ত

ফেনীর সোনাগাজীতে অবৈধ বালি উত্তোলন ও স্তুপে হুমকিতে ২৫০ কোটি টাকার দু’টি ব্রিজ। একটি রক্ষায় সব ধরনের বালু ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন গণবিজ্ঞপ্তি জারি করলেও অপরটি রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ব্রিজগুলো হল, ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সংযোগ স্থলে ছোট ফেনী নদীর ওপর প্রায় ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সাহেবের ঘাট সেতু ও বড় ফেনী নদীর ওপর ৪০ দরজা বিশিষ্ট ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায় মুহুরী প্রজেক্ট ব্রিজ সেতু।

সাম্প্রতি ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সাহেবের ঘাট সেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাহেবের ঘাট সেতু সংলগ্ন ছোট ফেনী নদী বালু সরবরাহ ও পরিবহন করার কারণে বর্তমানের সাহেবের ঘাট সেতু হুমকির পর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী সরকারি সম্পত্ত রক্ষার্থে সোনাগাজী উপজেলার ওলামা বাজার-নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার আঞ্চলিক সড়ক এবং তৎসংলগ্ন সাহেবের ঘাট সেতুর ওপর দিয়ে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ছোট ফেনী নদী হতে সড়ক বা নৌপথে যে কোনো ধরনের বালু নিয়ে সংশ্লিষ্ট সড়কের পাশে স্তুপ করা বালু সরবরাহ বা পরিবহন এবং সেতুর উপর দিয়ে ২০ টনের অধিক বোঝাই করা যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। বর্ণিত এলাকায় মজুদকৃত বালু স্থানান্তরের বিষয়ে পরবর্তীতে নির্দেশনা প্রদান করা হবে।

এমতাবস্থায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এই নিষেধাজ্ঞ অমান্য করে উল্লেখিত সড়ক ব্রিজের উপর দিয়ে বালু সরবরাহ বা পরিবহন এবং ছোট ফেনী নদী হতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত রাখে, তবে তাদের বিরুদ্ধে বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ এবং বায়ু দূষণ বিধিমালা ২০২২ অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এই দুটো ব্রিজের নদীতে বাল্ক স্থাপনের করে লাখ লাখ সেফটি বালি উত্তোলন ও বালুর মহাল তৈরি এবং মুসাপুর রেগুলেটর পুনঃনির্মাণ না করার কারণে ব্রিজগুলো হুমকির মুখে পড়েছে এবং নদীতে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ভাঙ্গনের কবলে পড়ে শত শত ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মসজিদ, মন্দির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গিয়েছে। আরো শত শত ঘরবাড়ি ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে রয়েছে।

সরে জমিন ঘুরে জানা যায়, ছোট ফেনী নদীর সোনাগাজী চর চান্দিয়া ও কোম্পানীগঞ্জের সংযোগস্থলে সাহেবের ঘাট ব্রিজ সংলগ্ন নদীতে এই এলাকার রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল প্রায় ১৫ টিরও বেশি বাল্ক স্থাপনের মধ্যে দিয়ে প্রতিদিন অবৈধভাবে লাখ লাখ সেফটি বালু উত্তোলন করে নদীর পাড়ে মহাল তৈরি করে রমরমা অবৈধ বালু ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফেনী জেলা প্রশাসন থেকে বৈধ কোনো ইজারা না থাকলেও লাখ লাখ সেফটি বালি উত্তোলন ও স্থানান্তরের কারণে ওই এলাকার পরিবেশ বিপর্যয়সহ সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে প্রতিদিন শত শত ডাম্প ট্রলি ওভারলোডিং করে ব্রিজের ওপর দিয়ে চলাচলের কারণে ব্রিজ হুমকির মুখে পড়েছে। ইতোমধ্যে সাহেবেরও ঘাট ব্রিজের পিলারের গোড়ায় মাটি বালি সরে গিয়ে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে তীব্র ভাঙ্গনের ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত। মানুষের হাহাকার বিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছে।

একইভাবে সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের থাক খোয়াজের লামচি মৌজার মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায়, বড় ফেনী নদীর উপর নির্মিত মুহুরী সেচ প্রকল্পের ২০০ মিটার দূরত্বে দেশের প্রথম বায়ু বিদ্যুৎ সংলগ্ন স্থানে, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় একাধিক বাল্ক হেড স্থাপন করে, প্রতিদিন লাখ লাখ সেফটি বালি উত্তোলন করে বালুর মহাল তৈরির মাধ্যমে, অবৈধ বালু ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে প্রতিদিন শত শত ড্রাম ট্রাক অতিরিক্ত লোডিং এর মধ্য দিয়ে সড়ক ব্রিজের উপর দিয়ে যাতায়াতের কারণে পর্যটন এলাকার পরিবেশ দূষণসহ মুহুরী ব্রিজ হুমকির মুখে পড়েছে। নদীতে ইতোমধ্যে ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী কিছুদিনের মধ্যে দেশের প্রথম বায়ু বিদ্যুতের একটি টাওয়ার এবং কোটি টাকার ব্যয় নির্মিত নদী রক্ষা বাধ বড় ফেনী নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

স্থানীয় কৃষক জামশেদ আলম ও ইসমাইল হোসেন জানান, রাজনৈতিক নেতারা নদীতে মেশিন বসিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর উপকূলে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এবং দেশের প্রথম বায়ু বিদ্যুৎ একটি টাওয়ার ও ব্রিজ হুমকির মুখে পড়েছে। দ্রুত বালু উত্তোলন বন্ধ না করলে বেড়িবাঁধসহ এই এলাকা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক প্রতিবেদককে বলেন, ‘সোনাগাজীতে কোনো বৈধ বালুর মহাল নেই। আমরা ইতোমধ্যে সাহেবের ঘাট ব্রিজ এলাকায় অবকাঠামগত সমস্যার কারণে বালি ব্যবস্থাপনার সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছি। মুহুরী প্রজেক্ট সেতু এলাকায়ও বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। সেখানেও যদি স্থাপনা ও অবকাঠামো কোনো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় আমরা এখানেও বালু ব্যবস্থাপনা বন্ধ করে দেবো।’