সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার কুড়ারবাজার ইউনিয়নের আঙ্গারজুরে কুশিয়ারা নদীর চর থেকে রাতের আঁধারে বালু লুট করছে একটি প্রভাবশালী চক্র।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে আঁতাত করে গত মধ্য রমজান থেকে অর্ধশত ট্রাক দিয়ে চরের আনুমানিক দশ লাখের বেশি ঘনফুট বালু লুট করেছে চক্রটি। দীর্ঘদিন থেকে বালু লুট অব্যাহত থাকলেও অদৃশ্য কারণে প্রশাসনের কর্মকর্তারা নীরব। সরেজমিনে গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলে, তবে প্রশাসনের দাবি বালু লুটের ব্যাপারটি তারা জানে না।
জানা গেছে, প্রভাবশালী বালু খেকো ওই চক্রের সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, এলাকার কিছু যুবক, ট্রাকচালক ও মালিকরা জড়িত রয়েছেন। মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত অবৈধভাবে ট্রাক ও ট্রাক্টর দিয়ে বালু লুট করলেও স্থানীয়রা লুটপাটকারীদের ভয়ে মুখ খুলছেন না।
সিলেট জেলার চর ইজারা তালিকায় কুশিয়ারা নদীর আঙ্গারজুর এলাকার চরটির নাম না থাকায় ইজারা দেয়া হয়নি। ফলে সরকার কোটি টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, কুশিয়ারা নদীর আঙ্গারজুর এলাকার চরটি ইজারা প্রদান করতে কুড়ারবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তুতিউর রহমান তুতা গত ১১ ফেব্রুয়ারি সিলেটের জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেন। তিনি আবেদনে উল্লেখ করেন, তফসিলভুক্ত জটিলতার কারণে বিগত চার-পাঁচ বছর থেকে বালু মহালটি ইজারা প্রদান থেকে বিরত রাখা হয়েছে। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো: সরোয়ার আলম ১৩ ফেব্রুয়ারি হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ পরিচালনার জন্য নির্দেশনা দেন। তার সে নির্দেশনা এখনো মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়াধীন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন যুবক বলেন, গত মধ্য রমজান থেকে রাত ৪টার পর ট্রাক দিয়ে বালু ট্রাকে করে নেয়া হচ্ছে। রমজানে ভোর রাত ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এবং ঈদের দিন থেকে রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টায় বালু লুটপাট অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ লুটপাটের সাথে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র। যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের মধ্য অন্যতম সাকী আহমদ, শামীম আহমদ, রোয়েল আহমদ, ওমর, জাহাঙ্গীর আলম, ট্রাক্টরচালক শিব্বির আহমদ, ট্রাকচালক সাজু ও জাকারিয়া এবং নৌকাচালক কালা মিয়া। চক্রকে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কুড়ারবাজার ইউপি চেয়ারম্যান তুতিউর রহমানের বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী আঙ্গারজুরের গ্রামীণ সড়কের একটু দূরে চরটি বেশ কয়েক বছর থেকে দেখা দেয়। এখনো সরকারের তালিকাভুক্ত না হওয়া চরটি জেলার রাজস্ব অধিদফতর এবারো ইজারা প্রদান করেনি। সেই সুযোগে বালু খেকোরা চরের প্রায় ১০-১৫ ফুট গভীর খাদ করে বালু লুট করেছে।
অভিযুক্ত সাকী, রুয়েল ও ওমরের সাথে মোবাইলফোনে যোগাযোগ করলে তারা বালি লুটের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, হিংসার বশবর্তী হয়ে তাদেরকে ফাঁসাতে এমন ভূয়া অভিযোগ করতে পারে।
চরের পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা সাকীর বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগের ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি প্রশ্নটি এড়িয়ে বলেন, বর্তমানে তিনি সিলেটে বসবাস করেন। এসব ব্যাপারে কিছুই জানেন না। তবে আশেপাশের লোকজন এসবের সাথে জড়িত থাকতে পারেন বলে উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে কুড়ারবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তুতিউর রহমান তুতার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে নয়া দিগন্তকে বলেন, নদীর তীরবর্তী অংশ থেকে স্থানীয় একটি ইটভাটায় মাটি কেটে নেয়া হয়েছে। যেখান থেকে মাটি কাটা হয়েছে সে জায়গাটি ইটভাটার মালিকের।
তিনি বলেন, চরের বালু লুটের বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে সত্যতা পেলে প্রশাসনকে অবহিত করা হবে। তবে বালি লুট করল কারা, এ ব্যাপারে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি।
তবে অপর অভিযুক্তদের মধ্যে শিব্বির ও শামীমের মোবাইলফোনে কল দিলে তাদের নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। অন্যদের মোবাইল নম্বর না পাওয়ায় তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: ওমর ফারুক নয়া দিগন্তকে বলেন, এ ঘটনাটি জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা চরের বালু লুটের ব্যাপারে তথ্য পেয়েই গ্রাম পুলিশকে ঘটনাস্থল পাহারার নির্দেশনা দিয়েছি। শিগগিরই অভিযান চালিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।



