রায়হান উদ্দিন চৌধুরী অপু। ছিলেন অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। কৃষক বাবার একমাত্র সন্তান। স্বপ্ন ছিল ছেলেকে ডাক্তারি পড়াবেন। পড়া শেষে পরিবার হাল ধরাসহ এলাকাবাসীর বিনা পয়সায় চিকিৎসায় এগিয়ে আসবেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। ভয়াল ট্র্যাজেডি কেড়ে নিলো তার স্বপ্নে ভরা জীবনটা। সন্তানহারা হয়ে পড়লেন তার পরিবার।
আজ শুক্রবার (১১ জুলাই) চট্টগ্রামের মিরসরাই ট্র্যাজেডির ১৪ বছর পূর্ণ হলো। ২০১১ সালের ১১ জুলাই ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৪৫ কোমলমতি শিক্ষার্থী। এতে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন ৩৪ জন। আশপাশের অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আরো সাতজন ও একজন অভিভাবক ও দু’জন ফুটবলপ্রেমী নিহত হয়েছিলেন।
নিহতদের পরিবাগুলোর অভিযোগ করে বলেন, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন মহল ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা নিহতদের পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তার কোনো কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি।
শুক্রবার স্কুল আঙ্গিনায় কথা হয় ওই সময়কার অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া আমিন শরীফের মা হোসনেয়ারা, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী রায়হান উদ্দিন চৌধুরী অপুর বাবা সোলতান আহমদ, অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাজীব হোসেনের বাবা আনোয়ার পাশার সাথে।
অভিভাবকরা বলেন, ‘আমাদের সরকার বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তখন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের চাকরি দিবেন। কিন্তু আজ ১৩টি বছর কেটে গেলেও কেউ কোনো খোঁজ রাখেনি। এমনকি স্কুল কর্তৃপক্ষও কোনো ধরনের সহযোগিতা করেননি।’
তিনি বলেন, ‘শুধু এই দিবসটি এলে আমাদের ডেকে আনেন। আলোচনা সভা করেই সব শেষ করে দেন। সন্তানহারা পরিবারের সাথে দেখা বলা কিংবা কথা বলেন না তারা। অনেক পরিবার একমাত্র সন্তান হারিয়ে রোজগারের উপযোগী কেউ না থাকায় অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটান।’
আমিন শরীফের মা হোসনেয়ারা জানান, ‘আমিন শরীফ আমার একমাত্র সন্তান। বর্তমানে তার বাবার কোনো ইনকাম নেই। আমার ছেলে যদি থাকতো তাহলে আজ সে লেখা পড়া শেষ করে পরিবারের হাল ধরতো। কিন্তু ভয়াল এই দুর্ঘটনায় আমার সব কেড়ে নিয়েছে বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন।’
রায়হান উদ্দিন চৌধুরী অপুর বাবা সোলতান আহমদ ও রাজীব হোসেনের বাবা আনোয়ার পাশা বলেন, ‘শুধু দিবসটি এলে স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের ডাকেন। আর কখনো তারা খবর রাখেন না তারা আমাদের পরিবারগুলোর। আমাদের অনেক পরিবার একমাত্র সন্তান হারিয়ে দুঃখ কষ্টে জীবন যাচ্ছে। ১১ জুলাইয়ের এই দিনটিকে নিরাপদ সড়ক দিবস ঘোষণার দাবি জানালেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।’
আবুল কাশেম নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘আমার একটা সন্তান হারিয়েছি। আরেকটি সন্তানের একটি চাকরির জন্য বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি দফতরে ঘুরেছি। কিন্তু কেউ আমাদের সহযোগিতা করেনি। এমনকি স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে গেলেও তার কোনো ধরনের সহযোগিতা কিংবা আশ্বাস দেননি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।’
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ১১ জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাই স্টেডিয়ামে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলা শেষে একটি ট্রাকে করে বিজয়োল্লাস করে আবুতোরাবে ফেরার পথে সৈদালীতে একটি ডোবায় শিক্ষার্থীদের বহনকারী মিনি ট্রাকটি উল্টে যায়। ওই সময় পিকআপের তলানিতে আটকে পড়া কোনো খুদে শিক্ষার্থীকে বাঁচানো যায়নি। একে একে নিথর দেহে পরিণত হয় আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩৪ জনসহ আশপাশের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাতজন ও একজন অভিভাবক ও দু’জন ফুটবলপ্রেমী যুবকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রচিত হয় মিরসরাই ট্র্যাজেডি। ওই বছর ট্র্যাজেডিতে নিহতদের স্মরণীয় করে রাখতে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রবেশমুখে স্থাপন করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ আর দুর্ঘটনাস্থলে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিস্তম্ভ ‘অন্তিম’।
দিবসটি উপলক্ষে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সকাল ১০টার দিকে নিহতদের স্মরণে দু’স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন, বেলা ১১টার দিকে স্কুলের হলরুমে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার, নিহতদের পরিবার, স্বজন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও এলাকাবাসী।



