নারী দিবস

শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সবক্ষেত্রেই পিছিয়ে নারী চা শ্রমিকেরা

নারী দিবসে তাদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তারা চান ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার।

Location :

Maulvibazar
নারী চা শ্রমিকরা
নারী চা শ্রমিকরা |নয়া দিগন্ত

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা
আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। চা বাগানের সবুজ বুকে নারীদের পাতা তোলার ছবি যতটা চোখকে মুগ্ধ করে, এই নারীদের জীবনের গল্প ততটা আনন্দদায়ক নয়। রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে চা বাগানের টিলায় টিলায় পাতা তুলেই নিঃশেষ হয়ে যায় নারী চা শ্রমিকের জীবন।

দেশে চা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকের অর্ধেকের বেশি নারী। পাতা বা কুঁড়ি তোলার প্রধান কাজটিই করেন নারী চা শ্রমিকেরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নারী শ্রমিকেরা এই কাজ করে গেলেও কাজের ক্ষেত্রে যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা, তার অনেক কিছুই এখনো নাগালে আসেনি। এই নারীরা অর্থ উপার্জন করলেও এখনো পরিবারে মতামত দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই তারা পিছিয়ে।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন চা বাগানের নারী শ্রমিকেরা জানান, সেই সাত সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয়। সংসারের কাজ করতে হয়। বাগান দূরে হলে আগেভাগে রওয়ানা দিতে হয়। সপ্তাহে সোমবার থেকে শনিবার পর্যন্ত সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। কেউ সকাল খেয়ে বের হন, কারো সময় না থাকলে বাটিতে খাবার নিয়েই ছুটতে হয়। দুপুরে খাবার বলতে চাল ভাজা, চায়ের কুঁড়ি পাতা, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ ইত্যাদি দিয়ে বানানো ‘পাতিচখা’ বা ‘পাতি চাতনি’। লাইনে (শ্রমিকদের বসতি) ফিরতে ফিরতে কারও সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টা বেজে যায়। ঘরে ফিরে আবার সংসারের কাজ করতে হয় তাদের।

ক্ষোভ প্রকাশ করে কমলগঞ্জের আলীনগর ও মাধবপুর চা বাগানের নারী শ্রমিকরা জানান, ১৭৮ টাকা মজুরি পেতে বাগানভেদে ২৫ থেকে ৩০ কেজি চা পাতা তুলতে হয়। বাড়তি চা পাতা তুললে যে পরিমাণ টাকা পাওয়ার কথা, তাও পান না বেশির ভাগ নারী শ্রমিক। কাজের স্থানে নারীদের জন্য শৌচাগার না থাকায় বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে তারা। নারী দিবস এ শ্রমিকদের সংগ্রামী জীবনে খুব একটা প্রভাব রাখতে পারে না। সেই বিষয়টাই জানা গেল তাদের সাথে আলাপে। তারা জানান, নারী দিবসে তাদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তারা চান ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার।

কমলগঞ্জের শমশেরনগর দেওছড়া চা বাগানের নারী শ্রমিক গীতা রবিদাস ও কানিহাটি চা বাগানের রুকমনিয়া মৃধা জানান, আমরা প্রতি বছর নারী দিবসের কথা শুনি। তবে এই দিবসে কী হয় তা আমরা জানি না। এই দিনে তো আমাদের কোনো ছুটিও নেই। কোনো সাহায্য সহায়তাও পাই না। অনেক দিবস এলেও আমাদের জীবনের বঞ্চনা ও কঠোর পরিশ্রমের গল্প তো আর শেষ হয় না। দারিদ্র্যের কারণে সন্তানদেরও পড়াশোনা ছেড়ে একই পেশায় আসতে হয়। ফলে আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। এছাড়া চা বাগানে বেতন কম হওয়ায় অনেকে বাইরে গিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক উপদেষ্টা রামভজন কৈরী বলেন, ‘চা বাগানে অর্ধেক নারী শ্রমিক হলেও নারী হিসেবে কর্মস্থলে যে সুযোগ-সুবিধা থাকার দরকার, তা তারা পাচ্ছেন না। কর্মক্ষেত্রে শৌচাগার নেই, কিন্তু চুক্তিতে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চা বাগানে সরকারি সুবিধা অনেকটা পৌঁছলেও আরো পৌঁছানো দরকার। চা বাগানে নারীরা উপার্জন করলেও অনেক ক্ষেত্রেই তারা পিছিয়ে। কিছু কিছু অগ্রগতি হলেও পরিবারে পুরুষেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। নারীর চিন্তাভাবনা কাজে লাগছে না। নারী চা শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য ডে কেয়ার নেই। ফলে কর্মজীবী মায়েরা তাদের সন্তানদের কোথায় রেখে কাজ করতে তা নিয়ে যেমন চিন্তায় থাকে, একইভাবে আদর-যত্ন থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা। প্রতিটি চা বাগানে নারী শ্রমিকদের সুখ-দুঃখ, ব্যক্তিগত বিষয়ে আলাপের জন্য একজন নারী কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন। একই সাথে সামাজিক ও ট্রেড ইউনিয়ণের সকল কর্মকান্ডেও নারী চা শ্রমিকদের কার্যকর অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন।’

মৌলিক সুবিধার দাবিতে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, ‘শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে মালিকপক্ষের সাথে আলোচনা হলেও অনেক সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য কর্মক্ষেত্রে শৌচাগার ও প্রক্ষালন কক্ষের অভাব একটি বড় সমস্যা।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট অঞ্চলীয় সভাপতি জিএম শিবলী বলেন, ‘চা বাগানের অনেকগুলোই বর্তমানে বন্ধের পথে, অনেকে শ্রমিকের মজুরি দিতে পারছেন না। কারণ চায়ের ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না।’