কিশোরগঞ্জের ছয়টি সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের বিপরীতে চারটি আসনে দলের সাত বিদ্রোহী প্রার্থী মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মাজহারুল ইসলাম। তিনি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছে।
সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) দুপুরে তিনি জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লার নিকট।
এদিকে এই আসনে মনোনয়ন না পেয়ে সোমবার বিএনপির ৪ বিদ্রোহী প্রার্থী মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন। মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে তারা লাগাতার আন্দোলন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে।
তারা হলেন—সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাসুদ হিলালী, জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও সাবেক ঢাকা বিভাগীয় স্পেশাল জজ রেজাউল করিম খান, সাবেক সহসভাপতি রুহুল হোসাইন ও সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি খালেদ সাইফুল্লাহ।
বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বলছেন, মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। আসনটিতে মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। একে অপরের প্রতি বিষোদগার করেছে। হয়েছে বাকযুদ্ধ।
এ আসনে বিএনপিতে কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে। প্রকাশ্য সমাবেশেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের পক্ষ থেকে সমালোচনা করা হচ্ছে। আমরা এসব নিয়ে চিন্তিত। আমরা চাই ব্যাক্তি ভেদাভেদ ভুলে সকলেই একসাথে দলীয় রাজনীতিটা করবেন।
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, ‘সদর হোসেনপুর উপজেলার জনগণের ভালোবাসায় ও প্রেসারে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছি। নির্বাচনে যাবো কি যাবো না তা আগামী ২০ জানুয়ারি মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহারের দিন আপনাদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবো।
কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনে আইনজীবী মো: জালাল উদ্দীনকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তিনি সোমবার দুপুরে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন। এ আসনে কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী নেই তাই নিশ্চিন্তে রয়েছেন জালাল উদ্দীন।
কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মুহাম্মদ ওসমান ফারুক মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। তিনি সোমবার দুপুরে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন। তবে এখান থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা।
বিদ্রোহী প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা গত ১২ ডিসেম্বর জেলা শহরের স্টেশন রোডে অবস্থিত হোটেল শেরাটনের মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক বর্তমানে ৮৭ বছর বয়সের একজন বয়োবৃদ্ধ এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি বলে মন্তব্য করেন।
ওসমান ফারুক বয়সের ভারে ডিমেনসিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে একাকী চলাফেরা করতে পারেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি। এর আগে গত ১২ নভেম্বর বিশাল শো-ডাউন করেন মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা।
কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা বলেন, বিগত দিনে দলের ক্রান্তিকালীন ও দুর্যোগপূর্ণ সময়ে নেতাকর্মীদের পাশে আমি যেভাবে ছিলাম আমি প্রতিশ্রুতি দিতে চাই আগামীতেও দল আমাকে কিভাবে মূল্যায়ন করল সেটা বড় বিষয় নয়। এই কথা সত্য দল আমাকে পরিচিতি দিয়েছে, সেই দলেই আমার শেষ ঠিকানা। এটার মধ্যেই আমি বিশ্বাস রাখতে চাই।
কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনে আলোচিত বিএনপি নেতা ফজলুর রহমানকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। রোববার (২৮ ডিসেম্বর) তিনি ইটনায় নির্বাচন কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। মনোনয়ন না পাওয়া বিএনপি নেতা সাবেক জেলা প্রশাসক আবদুর রহিম মোল্লাও রোববার (২৮ ডিসেম্বর) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন। আব্দুর রহিম মোল্লাও মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে লাগাতার বিক্ষোভ করেছেন। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রহিম মোল্লাকে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনে বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগদান করা সৈয়দ এহসানুল হুদাকে বিএনপির চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তিনিও সোমবার দুপুরে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন। এ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে সোমবার দুপুরে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন। যদিও এখানে বিএনপি থেকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল শেখ মজিবুর রহমানকে। কিন্তু গত ২২ ডিসেম্বর নিজের দল বিলুপ্ত করে সৈয়দ এহসানুল হুদা বিএনপিতে যোগদান করায় তাকেই চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর আবারও উত্তপ্ত হয় বাজিতপুর। গত ২৪ ডিসেম্বর বাজিতপুরের সরারচর রেলস্টেশনে রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করে শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের সমর্থকরা। পরে গত ২৬ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কারণে একদিন বিরতি দিয়ে ফের বিক্ষোভ করেন তারা। গত ২৭ ডিসেম্বর ও ২৮ ডিসেম্বর মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে কাফনের কাপড় পরে বিক্ষোভ মিছিল ও মশালমিছিল করে ইকবালের সমর্থকরা।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, আমি মনোনয়ন পত্র দাখিল করিনি। আমার পক্ষে বাজিতপুর নিকলীর বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাসহ সর্বস্তরের জনগণ মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন। তাদের আবেগ অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমি প্রার্থী হয়েছি।
কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনে বিএনপি থেকে মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শরীফুল আলম। বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকায় নিশ্চিন্তে রয়েছেন শরীফুল আলম।
জেলার ৬টি আসনে বিএনপির মোট সাতজন বিদ্রোহী মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন। দলের বিভক্তি নিরসনে জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে কি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি শরীফুল আলম বলেন, ‘মনোনয়ন দেয়া হয় দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে। আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে এসেছেন। জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে আমি বিষয়টি কেন্দ্রে জানাবো। দলের সভাপতি হিসেবে আমি চাই না কেউ বিদ্রোহী থাকুক। দলটা সবাইকে নিয়েই করতে হবে।’
এদিকে কিশোরগঞ্জ রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে জেলার ছয়টি আসনে মোট ৬১ জন মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন।



