আসন্ন ঈদুল ফিতরে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রবেশদ্বার ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের পদ্মা সেতুর মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের টোল প্লাজায় সার্বক্ষণিক মোট ১৭টি টোল বুথ চালু রাখা হয়েছে। এবারই প্রথম ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রাপথে সেতুর উভয় প্রান্তে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) সিস্টেম অর্থাৎ ইটিসি টোল বুথের সুবিধা ব্যবহার করতে পারছেন। যাতে করে ইটিসি কার্ডধারী গাড়িগুলো বিরতিহীনভাবে দ্রুত সেতু পার হতে পারবে। একইসাথে বিশেষ বাড়তি ব্যবস্থায় মোটরসাইকেলের উপচে পড়া ভিড় ঠেকানোসহ টোল আদায় কার্যক্রম সার্বক্ষণিক সচল রাখতে চালু থাকবে অতিরিক্ত আরো তিনটি সাময়িক টোলবুথ।
এদিকে সেতু বিভাগের আওতাধীন সকল সেতু ও স্থাপনায় সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনসমূহের ট্র্যাফিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক তদারকি এবং মনিটরিংয়ের জন্য টোল প্লাজা ও টোল বুথে সিসিটিভি ক্যামেরা চালু রাখার ব্যবস্থা নিয়েছে সেতু বিভাগ। এ লক্ষ্যে পদ্মা সেতুর টোলপ্লাজার ট্রাফিক মনিটরিং সেন্টার থেকে সেতুর লোয়ার ডেক, আপার ডেক, সংযোগ সড়ক, ওজন স্কেলসহ দুইপাশের টোলপ্লাজায় মোট ১৮১টি অত্যাধুনিক সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমের ক্যামেরা দিয়ে ফুল অপারেশনে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সেতু কর্তৃপক্ষের পদ্মা সেতুর সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় নয়া দিগন্তকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহাসড়কের বাবুবাজার, আব্দুল্লাহপুর, ধলেশ্বরী টোলপ্লাজা, ছনবাড়ী, খানবাড়ীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বাড়তি টহল টিম বসিয়ে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিং বন্ধে টহল কার্যক্রম জোরদার করেছে হাইওয়ে পুলিশ বিভাগ।
পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে,গেলো ঈদুল ফিতরের আগে থেকেই ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যানবাহনগুলো দ্রুত পদ্মা সেতু পাড়ি দিতে ঘণ্টায় ৮০কিলোমিটার বেগে যানবাহন চলার নির্দেশনা দিয়েছিলো সেতু বিভাগ। আর এতে করে এক্সপ্রেসওয়েতে যানজট না হওয়ার পাশাপাশি কোন যানবাহনকে আটকে থাকতে হচ্ছে না। তাছাড়া ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ইটিসি লেনসহ সেতুর মাওয়া প্রান্তের টোল প্লাজায় নয়টি ও জাজিরা প্রান্তে মোট আটটিসহ মোট ১৭টি বুথ সচল রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে বাড়তি মোটরসাইকেলের উপচে পড়া ভিড় ঠেকাতে মাওয়া প্রান্তে আরো তিনটি সাময়িক বুথের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঈদে সবগুলো বুথ সচল রাখতে অতিরিক্ত টোল কালেক্টর নিয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি টোলপ্লাজায় চালক ও যাত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদানের সুবিধার্থে আইটিএসের আওতায় ভ্যারিয়েবল ম্যাসেজ সাইন সুবিধা রাখা হয়েছে। এছাড়াও যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবিলার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক রেকার, ফায়ার ভেহিক্যাল ও অন্যান্য জরুরি সেবা যান প্রস্তুত রাখা, ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা জোরদার করা এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হচ্ছে।
জানা গেছে, আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে পদ্মাসেতুর টোলপ্লাজায় ঈদে ঘরমুখো যানবাহনের বাড়তি চাপ এখনো শুরু হয়নি। গত বৃহস্পতিবার রাত ১২টা থেকে ২৪ ঘন্টায় মাওয়া প্রান্তে নয় হাজার ৫০৬টি ও জাজিরা প্রান্তে আট হাজার ৯৫৮টিসহ মোট যানবাহন পারপার হয়েছে ১৮ হাজার ৪৬৪টি। অথচ গেলো বছরের দুই ঈদের আগ মুহুর্তে ঈদুল ফিতরের সময় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ হাজার এবং ঈদুল আজহায় সাড়ে ৩৩ হাজার যানবাহন পারাপার করা হয়েছিলো। গতকাল শুক্রবারও টোলপ্লাজায় যানবাহনের চাপ এখন পর্যন্ত না থাকলেও ঈদের আগ মুহুর্তে থেকে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এদিকে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষ্যে গত বুধবার ১১ মার্চ বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের স্থাপনা ব্যবহার করে চলাচলকারী যাত্রীসাধারণের যাতায়াত নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে সেতু বিভাগের সম্মেলন কক্ষে একটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ।
এ সময় তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আসন্ন পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষ্যে সারাদেশের জনসাধারণের ঈদযাত্রা নিরাপদ, আরামদায়ক, নির্বিঘ্ন, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও স্বস্তিময় করতে সদয় নির্দেশনা প্রদান করেছেন। একইসাথে মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী বিষয়গুলো সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছেন।’
সেতু সচিব ঈদযাত্রায় ব্যবসায়ী ও যাত্রীসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সংশ্লিষ্ট জেলা ও স্থানীয় প্রশাসনসহ পুলিশের বিভিন্ন বিভাগের সহযোগিতা কামনা করেন। সভায় সেতু বিভাগ, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাগণ, কর্তৃপক্ষের আওতাধীন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকগণ, সাইট অফিসের কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও সাইট অফিস সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং সিটি করপোরেশন-এর কর্মকর্তাগণ অনলাইন জুম প্লাটফর্মে সভায় যুক্ত ছিলেন।
সেতু কর্তৃপক্ষের পদ্মাসেতুর সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় নয়া দিগন্তকে জানান, মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের টোল প্লাজায় দুইটি ইটিসি লেন, মোটরসাইকেলের জন্য অতিরিক্ত তিনটি সাময়িক বুথ, মূল টোলবুথসহ মোট ২০টি টোল বুথের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে যানবাহনের বাড়তি চাপ এখনো পড়েনি। একইসাথে ঈদের আগ মুহুর্তে বাড়তি যানবাহনের চাপ সামলাতে টোল প্লাজায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে সেবা দিতে তাদের দায়িত্বরত কর্মকর্তারাসহ সর্বদা প্রস্তুত রয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন, হাইওয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সসহ সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা নিবিড় সমন্বয় ও কার্যকর যোগাযোগ বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করছেন বলে তিনি আরো জানান।
হাঁসাড়া হাইওয়ে থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এটিএম মাহমুদুল হক নয়া দিগন্তকে জানান, পদ্মাসেতু হয়ে এ মহাসড়কে এক্সপ্রেসওয়েতে ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাত্রা নির্বিঘ্ন ও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিং বন্ধে বিভিন্ন পয়েন্টে র্যাব, পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সাথে সমন্বয় করে হাইওয়ে পুলিশের টহল কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের ছয়টি ইউনিট ও দুইটি মোবাইল টিম দিনরাত পর্যায়ক্রমে কাজ করছে।
আনফিট যানবাহন প্রসঙ্গে তিনি জানান, এ ধরণের যানবাহন দৃশ্যমান হলেই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
পদ্মাসেতু উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আক্তার হোসেন নয়া দিগন্তকে জানান, ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়তি প্রস্তুতি রয়েছে। একইসাথে ঈদপূর্ব ও ঈদপরবর্তী খানবাড়ী পয়েন্ট ও সেতু এলাকায় উত্তর থানা পুলিশের তিনটি টহল টিম সার্বক্ষণিক কাজ চালিয়ে যাবে।



