পিরোজপুর-২ আসন

বিদ্রোহী প্রার্থীর চাপে বেকায়দায় ধানের শীষ, সুবিধায় দাঁড়িপাল্লা

বিএনপির দলীয় প্রার্থী ভান্ডারিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন ও দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করা বিএনপির সাবেক নেতা মাহামুদ হোসেনের দ্বন্দ্বে বিএনপির ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন নেতাকর্মীরা। তাদের আশঙ্কার ফায়দা নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী।

মামুন হোসেন, ভান্ডারিয়া (পিরোজপুর)

Location :

Pirojpur
জামায়াতের প্রার্থী শামীম সাঈদী, বিএনপির প্রার্থী আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদ হোসেন
জামায়াতের প্রার্থী শামীম সাঈদী, বিএনপির প্রার্থী আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদ হোসেন |নয়া দিগন্ত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া, কাউখালী ও নেছারাবাদ) আসনে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী। দলীয় প্রার্থী ও বিদ্রোহীর মধ্যে ইতোপূর্বে সংঘর্ষসহ হুমকির ঘটনা ঘটেছে। আর এই সুযোগে আসনটি দখলের স্বপ্ন দেখছে জামায়াতে ইসলামী।

পিরোজপুর-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে ধানের শীর্ষ প্রতীক নিয়ে লড়াই করছেন দলের ভান্ডারিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে লড়াই করছেন জামায়াত জোটের প্রার্থী আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদী, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে লড়াই করছেন বিএনপির সাবেক নেতা মাহামুদ হোসেন এবং হাত পাখা প্রতীক নিয়ে লড়াই করছেন ইসলামী আন্দোলনের আবুল কালাম আজাদ। এছাড়াও এ আসনে জাতীয় পার্টির মাহিবুল হোসেন (বাইসাইকেল), এবি পার্টির ফয়সাল খানের (ঈগল) প্রচার-প্রচারণা তেমন চোখে পড়েনি।

দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন বিএনপির সাবেক নেতা ও ভান্ডারিয়া সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি মাহামুদ হোসেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাকে বিএনপি সম্প্রতি বহিষ্কার করেছে। এ আসনে জামায়াত-বিএনপিসহ ত্রিমুখী লড়াই হবে। এ সকল প্রার্থীরা নির্বাচনী সভা সমাবেশসহ বিভিন্নভাবে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

পিরোজপুর-২ আসনের বিভিন্ন উপজেলার সাধারণ মানুষের সাথে কথা বললে তারা জানান, যোগ্যতার দিক থেকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র ) প্রার্থী কেউ কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই।

একজন প্রবীণ ভোটার বলেন, ‘প্রচারে এগিয়ে তিনজনই ভদ্র, শিক্ষিত ও এলাকার মানুষের খোঁজ-খবর রাখেন। তবে, কে বেশি ও ভালো কাজ করবে সেটাই আমাদের কাছে মূল বিষয়।’

জানা গেছে, পিরোজপুর-২ আসনটি দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। গত ৫ আগস্ট ছাত্র বিপ্লবের পর সাবেক সাংসদ আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এ আসনে আর ফিরেননি। এ আসনের আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক সাংসদ মহিউদ্দিন মহারাজ দলবল নিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।

বিএনপির দলীয় প্রার্থী ভান্ডারিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন ও দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করা বিএনপির সাবেক নেতা মাহামুদ হোসেনের দ্বন্দ্বে বিএনপির ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন নেতাকর্মীরা। তাদের আশঙ্কার ফায়দা নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। এ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী শহীদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মেজ ছেলে শামীম সাঈদী। এ আসনে বিএনপি, স্বতন্ত্র ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। নির্বাচনী মাঠে তিন প্রার্থীই সক্রিয়ভাবে গণসংযোগ ও প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন, যার ফলে এলাকার রাজনীতিতে বাড়ছে উত্তাপ।

তবে শামীম সাঈদীর ক্ষেত্রে একটি বাড়তি পরিচিতি কাজ করছে বলে অনেকের ধারণা। তার বাবা শহীদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত পরিচিতির কারণে তিনি মানুষের কাছে আগে থেকেই পরিচিত। এই পরিচিতি তাকে দল, মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ভোটারের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে বলে স্থানীয়দের মত।

অন্যদিকে, পিরোজপুর-২ আসনের মাঠে বিএনপির প্রার্থী আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন ঘাঁটি শক্তিশালী করতে সম্প্রতি জাতীয় পার্টির একটি অংশের নেতাকর্মীদের দলে নিয়েছেন এবং দলীয় ঐতিহ্য ও ভোটব্যাংক তাদের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ আসনে বিএনপি প্রার্থী সুমনের বাবা নুরুল ইসলাম মন্জু সাবেক সাংসদ ছিলেন।

অপর দিকে, বিএনপির সাবেক নেতা, স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদ হোসেনের সাথে পিরোজপুর-২ আসনের বিএনপির একাংশ কাজ করছেন। এছাড়া মাহমুদ হোসেন পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সাংসদ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর আপন চাচাত ভাই হওয়ায় জাতীয় পার্টির বেশকিছু নেতাকর্মী তার পক্ষে কাজ করছেন। ফলে, ভোটের মাঠে তাদের প্রার্থীও ব্যাপক লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছেন বলে প্রার্থীর নেতাকর্মীরা মনে করেন।

ভোটারদের মতামতে রয়েছে বৈচিত্র্য। কেউ বলেন, যাকে যোগ্য মনে করব, তাকেই ভোট দেবো। আবার কেউ স্পষ্টভাবে বলেন, ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখতে চাই। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকরা বলছেন, তারা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে একটি দুর্নীতিমুক্ত ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। তারা আরো বলেন, বিএনপির দুই গ্রুপের চলমান দ্বন্দ্বে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে জামায়াত। এ আসনে দাঁড়িপাল্লার নিরব বিপ্লব ঘটবে বলে নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা।

নাম না প্রকাশের শর্তে অনেক ভোটাররা জানান, এ আসনে দলবলের মধ্যে ভোট কাটার ফ্যাসিস্ট মাস্টার মাইন্ড ঢুকে পড়েছে। তারা অতি উৎসাহী হয়ে ভোট ডাকাতি করতে পাড়ে। এমন হলে ভোটের মাঠের পরিস্থিতি খারাপ হবে। ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়বে। আর এ কারণে ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদরা।

উল্লেখ্য, ভান্ডারিয়া, কাউখালী ও নেছারাবাদ উপজেলা নিয়ে পিরোজপুর-২ আসন। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ নয় হাজার দুই শত ৮৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা দুই লাখ চার হাজার তিন শত ১২ জন। মহিলা ভোটার সংখ্যা দুই লাখ চার হাজার নয় শত ৭২ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার সংখ্যা চারজন। তবে, এ আসনে বেশি ভোট নেছারাবাদ উপজেলায়।