‘যে টাকা দিয়ে চামড়া কিনেছি, সেই টাকাও উঠছে না। লাভ তো দূরের কথা। এখনো রাস্তার পাশে পড়ে রয়েছে, কী করবো বুঝতেছি না। এমন হবে জানলে চামড়া কিনতাম না। কান ধরেছি জীবনেও আর চামড়া ব্যবসা করবো না।’
আক্ষেপ নিয়ে, হতাশ হয়ে কথাগুলো বলছেন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী আকবর বাদশা।
আকবর বাদশা বলেন, ‘ফেনীর বড় এক ব্যবসায়ী ৩০০ টাকা করে রেট দিয়েছিল, তাই ১৫০ টাকা ২০০ টাকা ৫০০ চামড়া ক্রয় করেছি। বাড়ি থেকে সংগ্রহ করে, বাজারে নিয়ে আসা, লবন মাখা, শ্রমিকদের মজুরীসহ প্রতি পিস চামড়ায় ৩০০ টাকা পড়ে গেছে। এখন ওই ব্যবসায়ী মোবাইলও ধরছে না। প্রায় ৫০০ পিস চামড়া কিনেছি, কী যে করেবো মাথায় কিছু ডুকছে না।’
আরেক ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন বলেন, ‘ঈদের সারাদিন ঘুরে ঘুরে চমড়া সংগ্রহ করে, বিকেলে বাজারে তোলার পর প্রথম পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টা কেউ জিজ্ঞেস করতে আসেনি। পরে রাতে আমার ছোট ভাই গড়ে ২২০ টাকা করে লোকসানে সব চামড়া বিক্রি করে দিয়ে কোনো রকম রেহাই পেয়েছি।'
শুধু আকবর বাদশা, মোশারফ হোসেন নয়, এভাবে চামড়া কিনে লোকসানে পড়েছেন মিরসরাই উপজেলার ১৬ ইউনিয়ন দুই পৌরসভার শত শত মৌসুমী ব্যবসায়ী।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন বাজারে বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে চামড়া স্তুপ পড়ে রয়েছে। এসব চামড়া থেকে প্রচণ্ড দুর্গদ্ধ ছড়াচ্ছে। আশপাশের ব্যবসায়ীরা দোকানে বসে পারছে না। পথচারিদের হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। অনেকে পথচারিকে নাক ধরে হাঁটতে দেখা গেছে।
মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, সরকার নির্ধারিত দাম ঘোষণা করলেও বাস্তবে সেই দামের অর্ধেকেও চামড়া বিক্রি করা যাচ্ছে না। এতে লোকসানের শঙ্কায় হতাশ হয়ে এক আড়ত থেকে আরেক আড়তে ঘুরছেন তারা।
বারইয়ারহাট এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আকতার হোসেন বলেন, এবার কোরবানি দাতারা তাদের পশুর চামড়ার উপযুক্ত দাম পায়নি।
অন্যদিকে লোকসান গুনতে হয়েছে গ্রাম থেকে সংগ্রহকারী খুচরা ব্যবসায়ীদের। তবে বরাবরই লাভবান সিন্ডিকেট। বারইয়ারহাট রেললাইনের পাশে সড়কের উপর এভাবেই ফেলে চলে যায় কোরবানির পশুর চামড়া। এসব পশুর চামড়া দীর্ঘ সময় পড়ে থাকার ফলে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। যার কারণে চলাচলকারী মানুষের কষ্ট হচ্ছে।
ডাকঘর এলাকার আবু দাউদ বলেন, দুই শতাধিক চামড়া কিনেছি, পরে লোকসানে পানির দরে বিক্রি করেছি। চামড়া সংগ্রহ করা শ্রমিকের মজুরিও উঠেনি।
উপজেলার বড়তাকিয়া বাজারে সড়কের পাশে সারি করে রাখা হয়েছে শত শত চামড়া। অনেক ব্যবসায়ী সম্ভাব্য ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত দর পাচ্ছেন না। তাদের অভিযোগ, প্রতি বছরই সরকার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় না।
ইতোমধ্যে প্রশাসন থেকে অবিক্রিত চামড়ার জন্য বিনামূল্যে লবণ বিতরণ করার ঘোষণা থাকলেও সাধারণ মানুষ তা সঠিকভাবে জানতেন না। অবিক্রিত চামড়ায় লবণ দিয়ে বিক্রির কথা বলা হয়ে থাকলেও ব্যবসায়ীরা তা করেননি। ফলে ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার সাথে সাথে তাতে পচন ধরে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার জানান, সরকার চামড়া বিক্রির দাম প্রকাশ করেছে। কিভাবে সংরক্ষণ করতে হবে তাও বলে দিয়েছে। বিনামূল্যে লবন দেয়ার ব্যবস্থা করেছে সরকার। প্রত্যেক এলাকায় চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফেলে যাওয়া ও পচনশীল চামড়া পরিস্কার করার জন্য মিরসরাই পৌরসভা কাজ করে যাচ্ছে।



