কুষ্টিয়ায় হামের প্রাদুর্ভাবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে শতাধিক শিশু।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) এ তথ্য জানা গেছে।
হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলছেন, হামে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে সাবধানতা ও সচেতনতার সাথে চিকিৎসকের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
জানা যায়, গত তিন মাস ধরে কুষ্টিয়ায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে দুইজনের মৃত্যুর খবরে হামে আক্রান্ত রোগীর স্বজনেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। ঠান্ডা বা জ্বরে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে চিকিৎসকের চেম্বারে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। জেলা সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে হামের লক্ষণ দেখার সাথে সাথে হাসপাতালে যোগাযোগ করার জন্য বলা হচ্ছে।
কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা: ফিরোজ আহমেদ জানান, হামে আক্রান্ত হওয়া শুরু হয় ডিসেম্বরে। জানুয়ারিতে কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হয় ১৫ জন, যাদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা খারাপ হলে তাদের অন্যত্র রেফার্ড করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে ভর্তি হয় ২০ জন, যাদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা খারাপ হওয়াতে রেফার্ড করা হয়। এদের মধ্যে একজনের মুত্যু হয়েছে। মার্চ মাসে দেড় শতাধিক হামে আক্রান্ত শিশু ভর্তি হয়েছে।
তিনি জানান, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ৪০ জন শিশু এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। হামে আক্রান্ত শিশুদের বেশির ভাগের বয়স এক বছরের নিচে। হামের প্রদুর্ভাব সাধারণত শিশুর জ্বর, ঠান্ডা ও পাতলা পায়খানার আলামত দেখা যায়। কিন্তু এবার শিশুরা নিউমোনিয়া থেকে হামে আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে শিশুর স্বাসকষ্ট বেড়ে যায় এবং ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় এ হাসপাতালে বিশেষ খেয়াল রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, হামের সাধারণ ওষুধ তেমন একটা কাজ করছে না, ফলে অধিক পরিমাণ পাওয়ার ফুল অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হচ্ছে তাতেও উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে না।
ডা: ফিরোজ আহমেদ জানান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি সেই সাথে সাবধানতা অবলম্বন ও মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। শিশুদের বাইরের সংস্পর্শ কমাতে হবে। এটা একটি ভাইরাসজনিত রোগ, ফলে মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে। আর টিকা না দেয়ার ফলে হামের এ প্রাদুর্ভাবের একটি বিশেষ কারণ বলে তিনি জানান।
এ হাসাপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুর মা জামেলা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলের নিউমোনিয়ার কারণে এখানে ভর্তি করেছিলাম বর্তমানে সে হামে আক্রান্ত হয়েছে।’
কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল ওয়ার্ডে মঙ্গলবার ২০ জন হামে আক্রান্ত শিশু ভর্তি ছিল। এর মধ্যে দুইজন চলে যায় এবং আরো দুইজন নতুন করে ভর্তি হয়।
ডা: হোসেন ইমাম বলেন, ২০ জন হামে আক্রান্ত শিশু ভর্তি রয়েছে। হাম যেহেতু ছোঁয়াচে সেই কারণে সিসিইউতে পৃথকভাবে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। হামের রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। এর আগে হাসপাতালে হামে চিকিৎসাধীন এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
জেনারেল হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশু ইয়াসের মা ইয়াসমীন জানান, ঠান্ডা থেকে নিউমোনিয়ার পর আমার ছেলে হামে আক্রান্ত হয়ে এখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এ হাসপাতালের সিনিয়র নার্স মদিনা খাতুন জানান, হামে আক্রান্ত শিশুদের সিসিউইতে রাখা হয়েছে। ডাক্তাররা সব সময় তদারকি করছেন।
এ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: আব্দুল মান্নান জানান, আমরা সব সময় মনিটরিং করছি। হামে আক্রান্তদের দিকে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। তিনি শিশুর জ্বর অথবা ঠান্ডাজনিত সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে আহ্বান জানান।
এদিকে, এ জেলার উপজেলা হাসপাতালগুলোতেও হামে আক্রান্ত শিশু ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে বলে জানা যায়। শহরের বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে হামে আক্রান্তরা চিকিৎসার জন্য গেলেও কোনো রোগী ভর্তি নেই বলে জানা যায়।
কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা: শেখ মোহাম্মদ কামাল জানান, হামের বিষয়ে আজ সকালে জরুরি সভা করেছি। সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছি। সব উপজেলা হাসপাতালে কমপক্ষে পাঁচটি বেড রেডি রাখা হয়েছে। নমুনা সংগ্রহ করার জন্য বলা হয়েছে। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রিপোর্ট করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
দুই শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে তিনি জানান, ‘আমি জেনেছি একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তবে টেস্টে তার হামের জীবাণু পাওয়া যায়নি।’
তিনি আরো জানান, ভ্যাকসিনের জন্য অধিদফতরে চাহিদা দেয়া হয়েছে। ভ্যাকসিন এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।



