বাংলাদেশে বিলুপ্তির পথে ‘সিঁদুরে লাল মৌটুসি’

সিঁদুরে-লাল মৌটুসি মূলত বনের পাখি। দেশের চিরসবুজ বন, পাতাঝরা বন, ঝোপঝাড় ও গরান বনে এদের বিচরণ বেশি। তবে কখনো কখনো গ্রাম ও শহরতলির ফুল বাগানেও মধু সংগ্রহে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। এদের জিহ্বা নলাকার হওয়ায় সহজেই ফুলের নির্যাস পান করতে পারে।

এম এ রকিব, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

Location :

Sreemangal
সিঁদুরে লাল মৌটুসি
সিঁদুরে লাল মৌটুসি |নয়া দিগন্ত

সিঁদুরে লাল মৌটুসি (Crimson Sunbird) বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন পাখির একটি। অগ্নিঝরা রঙের এই পাখিটি বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা গেলেও দেশে এটি প্রায় বিলুপ্ত প্রাজাতির তালিকায় রয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে পাখিটিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

জানা যায়, সিঁদুরে লাল মৌটুসি ‘সিঁদুরে মৌটুসি’ নামেও পরিচিত এবং এটি সিঙ্গাপুরের জাতীয় পাখি হিসেবে স্বীকৃত।

মৌটুসি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এই পাখিটি মূলত বন-জঙ্গলে বসবাস করতে পছন্দ করে। বাংলাদেশ ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বনে এটি ছোট, চঞ্চল ও উজ্জ্বল রঙের আবাসিক পাখি হিসেবে পরিচিত।

এই প্রজাতির পুরুষ পাখির গায়ের রং তুলনামূলক বেশি উজ্জ্বল। বুক ও পিঠ গাঢ় সিঁদুরে-লাল, পেটের দিক হলদে-জলপাই এবং ডানা কালচে। লেজ গোলাকার, অগ্রভাগ সাদা এবং লেজের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

অন্যদিকে স্ত্রী পাখিটির রং কিছুটা ম্লান। দেহের উপরের অংশ জলপাই-সবুজ এবং নিচের অংশ হলদে-জলপাই। গলা ও বুকে হালকা লাল আভা এবং ঠোঁট বক্রাকার থাকে। লেজ গোলাকার এবং অগ্রভাগ সাদা, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। সামগ্রিক গঠনে স্ত্রী পাখি পুরুষের মতো হলেও রঙে ভিন্নতা স্পষ্ট। রোদের আলোয় মাথার অংশ ও গোঁফে ঝিলিক দেখা যায়।

সিঁদুরে-লাল মৌটুসি মূলত বনের পাখি। দেশের চিরসবুজ বন, পাতাঝরা বন, ঝোপঝাড় ও গরান বনে এদের বিচরণ বেশি। তবে কখনো কখনো গ্রাম ও শহরতলির ফুল বাগানেও মধু সংগ্রহে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। এদের জিহ্বা নলাকার হওয়ায় সহজেই ফুলের নির্যাস পান করতে পারে। বাচ্চাদের খাদ্য হিসেবে ছোট মাকড়সা ও পোকামাকড় সংগ্রহ করে। সাধারণত একা বা জোড়ায় বিচরণ করে এবং তীক্ষ্ণ স্বরে ‘চি-চিই-চিই’ শব্দে ডাকে।

খাদ্যাভ্যাসে এরা ফুলের মধুর পাশাপাশি মাকড়সা ও ছোট পোকামাকড় খেয়ে থাকে। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এক ফুল থেকে অন্য ফুলে উড়ে বেড়ানো এবং বাতাসে ভেসে মধু পান করা এদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশের সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বনাঞ্চলে এই পাখিটির উপস্থিতি বেশি লক্ষ্য করা যায়। প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী-পুরুষ পাখি মিলে ছোট গাছ বা ঝোপের সরু ডালে ঝুলন্ত বাসা তৈরি করে। বাসার বাহিরের অংশ মাকড়সার জাল দিয়ে আবৃত করা হয়, যা দেখতে অত্যান্ত আকর্ষণীয়। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুলাই মাস এদের প্রজননকাল। এ সময় স্ত্রী পাখি দুই থেকে তিনটি ডিম পাড়ে এবং প্রায় দুই সপ্তাহ তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। জন্মের তিন সপ্তাহের মধ্যেই বাচ্চারা ডানা মেলে উড়তে শুরু করে।

প্রকৃতির অপূর্ব এই পাখিটি সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করে পরিবেশ প্রকৃতি ও পাখিপ্রেমী সৌখিন ফটোগ্রাফার এবং ছবির কবি তারিক হাসান জানান, সম্প্রতি হবিগঞ্জের সাতছড়ি বনে বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন এই পাখিটিকে তিনি ক্যামরাবন্দি করেন।