চন্দনাইশে আরো একটি খাল খনন কাজ শুরু

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের অধিনের চট্টগ্রামের চন্দনাইশে আরো একটি খাল পূর্ণ খনন কাজ শুরু হয়েছে।

এস এম রহমান, পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

Location :

Chandanaish
চন্দনাইশে আরো একটি খাল খনন কাজ শুরু
চন্দনাইশে আরো একটি খাল খনন কাজ শুরু |নয়া দিগন্ত

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের অধিনের চট্টগ্রামের চন্দনাইশে আরো একটি খাল পূর্ণ খনন কাজ শুরু হয়েছে।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকালে চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদ নিশিকান্ত যতখাল নামে এ খালটির পূর্ণ খনন কাজের উদ্বোধন করেন।

এসময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাজিব হোসেন, বিএডিসির চট্টগ্রাম অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক ইলিয়াস খান, দোহাজারী উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনসহ গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) কর্তৃক গৃহীত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে ওই প্রকল্পের অগ্রগতি ৬৮ ভাগ সম্পন্ন হয়। বিএনডিসির চলমান প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় নতুনভাবে সেচের আওতায় আসবে ১৮ হাজার ৯২০ হেক্টর অনাবাদি জমি। এতে দুই জেলায় প্রতিবছর ধান শাকসবজিসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে ৯৪ হাজার ৬০০ মেট্রিকটন। আর এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে ৬০২ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

প্রকল্পের পিডি মো: নুরুল ইসলাম প্রকল্প কাজের অগ্রগতির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রত্যাশাও করছেন।

তিনি জানান, চলমান ওই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫২৫ কিলোমিটার সেচ ও নিষ্কাশন খাল পূন:খনন করা হচ্ছে। পুন:খননকৃত খালে সেচের পানি সংরক্ষণ করার পাশাপশি খাল পুন:খননের ফলে জলাবদ্ধতা দূরীকরণ হবে। ফলে এক দুই ফসলি জমি-দুই তিন ফসলী জমিতে রূপান্তরিত হবে। এতে খালে ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যাতা বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া পুনঃখননকৃত খাল ও নদীতে ২৩৫টি বিদ্যুৎচালিত এলএলপি স্থাপন করা হবে, ফলে প্রকল্প এলাকায় ১৮৯২০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে এবং ৯৪৬০০ মেট্রিক টন ধানসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি শস্যদানা উৎপাদিত বৃদ্ধি পাবে। যার বর্তমান বাজার মূল্য হবে ১৮৯২০ লক্ষ টাকা।

নুরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের মুল উদ্দেশ্য হচ্ছে এই দুইজেলায় সেচ অবকাঠামো নির্মাণ ও আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি নির্ভর সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করা।

তিনি জানান,প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে জুলাই ২৩ থেকে আর প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ৩০ জুন ২০২৮ পর্যন্ত। আর এ প্রকল্পটি চট্টগ্রামের পটিয়া-চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, বাশঁখালী, আনোয়ারা, কর্ণফূলী, মিরেস্বরাই, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, স›ন্দ্বীপ, হাটহাজারী, বোয়ালখালী, লোহাগাড়া, ফটিকছড়ি ও সীতাকুন্ড এবং কক্সবাজারের সবকটি উপজেলায় একই সাথে এ প্রকল্প বাস্তায়নের কাজ চলছে। মূলত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে খাল পুনঃখনন ও সেচযন্ত্র সরবরাহ, আর্টেসিয়ান ও ডাগওয়েল স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় সেচ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে ৭৩,৭৯৫ হেক্টর জমিতে ভূ-উপরিস্থ পানি নির্ভর সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করে প্রতি বছর ৪,০৫,৮৭২.৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করাই মূল উদ্দেশ্য।

সরে জমিনে দেখা গেছে, এ প্রকল্পের দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন উপজেলায় খাল পূর্ণখনন কাজ চলমান থাকায় এবার পরপর কয়েক দফা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢল নদী ও খালের বিপদ সীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হলেও যথা সময়ে তা নিষ্কাশন হওয়ার কারণে জেলায় কৃষকের ফসল অনেকাংশই নিরাপদ ছিল বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

চলমান প্রকল্পে ৫২৫ কি.মি. সেচ ও নিষ্কাশন খাল পুনঃখনন, ২৩৫ টি এলএলপি পাম্প স্থাপন, ১২০ টি সোলার পাম্প স্থাপন, ৫০টি ভাগওয়েল নির্মাণ, ৫০০টি আর্টেসিয়ান ওয়েল স্থাপন, ৫২৯০০০ মিটার ব্যারিড পাইপ নির্মাণ, ৩০ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং ৯৮০টি সেচ অবকাঠামো নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করা হবে বলে প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে।

প্রকল্পের প্রতিবেদনে বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। দিন দিন এই জনসংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৫ ভাগ গ্রামে বাস করে এবং তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি উপর নির্ভরশীল। দেশের মোট ভূমির পরিমাণ নির্দিষ্ট হলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ক্রমবর্ধমান এই জনসংখ্যার বসতভিটা তৈরি ও বিভিন্ন উন্নয়মূলক কর্মকাণ্ডের কারণে প্রতিবছর কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশে কৃষি জমির পরিমাণ মোট ভূমির ৭০.২%। মাথাপিছু কৃষি জমির পরিমাণ ১২.৫ শতক, প্রতিবছর ০.৫৬% হারে কৃষি জমি অকৃষি জমিতে রূপান্তরিত হচ্ছে তাতে ০.৮৬-১.১৬% ধান উৎপাদন কমছে ।এই হারে জমি হ্রাস পেতে থাকলে আগামী ৫০ বছরে কৃষি জমির পরিমাণ আরও ১৫% কমে যাবে। জমির পরিমাণ কমে এলে স্বাভাবিকভাবে ফসল উৎপাদনও হ্রাস পাবে।

এছাড়া জলাবদ্ধতা, লবনাক্ততা, খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা ইত্যাদি দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির প্রভাবতো আছেই। এমতাবস্থায়, দেশের এই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা আজ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশে উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল উৎপাদন অনেক আগেই শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান ফসল ধান যা সেচ ব্যতিত চাষ করা অসম্ভব।

অন্যান্য ফল ও সবজী উৎপাদনের জন্যও সেচ অপরিহার্য। এদিকে উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল আবাদের পূর্ব শর্ত হলো সেচ। সেচের পানি ছাড়া আশানুরুপ ফলন ফলানো একবোরেই অসম্ভব।স কারণে দেশে একটি আধুনিক এবং টেকসই সেচ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার মোট আয়তন ৭৭৭৪৮০ হেক্টর এবং মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমান ২৬৫৬০১ হেক্টর হলেও এ দুই জেলায় মোট সেচকৃত জমি মাত্র ১২৯৬১৫ হেক্টর যা মোট চাষযোগ্য জমির ৪৮.৮০ ভাগ অর্থাৎ এখনো প্রায় অর্ধেকের বেশি চাষযোগ্য জমি সেচের আওতা বহির্ভূত রয়েছে। এ বিশাল পরিমাণ জমি পতিত ও সেচের বাহিরে রেখে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। সে কারণে সরকার মুলত এ প্রকল্পটি প্রণয়ন করেন। প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার বিপুল জমি চাষের আওতায় এনে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও আধুনিক ও টেকসই সেচ আবাদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রকল্পটি প্রণয়ন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন প্রকল্প পরিচালক মো.নুরুল ইসলাম।