ওয়ার্ড কাউন্সিলর থেকে সিলেটের মেয়র

প্রথমবার এমপি হয়েই দুই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী

সিলেট-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী মন্ত্রিসভায় দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেছেন। তিনি প্রবাসীকল্যাণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
আরিফুল হক চৌধুরী
আরিফুল হক চৌধুরী |নয়া দিগন্ত

সিলেট-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী মন্ত্রিসভায় দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেছেন। তিনি প্রবাসীকল্যাণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

তার মন্ত্রিত্ব লাভের খবর ছড়িয়ে পড়লে তা ‘টক অব দ্য সিলেট’-এ পরিণত হয়। সিলেটবাসীর মাঝে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা যায়।

আরিফুল হক চৌধুরী ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) ওয়ার্ড কাউন্সিলর। এর আগে ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের সাহচর্যে সিলেট নগরে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন তরুণ আরিফুল হক চৌধুরী। এম সাইফুর রহমানের দেখা পেতে জাঁদরেল মন্ত্রী-নেতারা সিলেটে এসে অবস্থান করতেন। রাজধানীতে ব্যস্ত অর্থমন্ত্রীকে ধরা ছিল কঠিন কাজ। তাই তারা চলে আসতেন সিলেট ও মৌলভীবাজারে। এসে মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত আরিফুল হক চৌধুরীর সহায়তা নিতেন। তিনিও নিরাশ করতেন না; দেখা করিয়ে দিতেন মন্ত্রী সাইফুর রহমানের সাথে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তিনি সিসিকের নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তার হাত ধরেই তৎকালীন সরকারের আমলে সিলেট নগরীর পরিবর্তন সাধিত হয়।

সেই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৩ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে আরিফ নির্বাচিত হন সিসিকের মেয়র। সিসিকের মেয়র থাকাকালে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে সারাদেশে আলোচনায় আসেন আরিফ। তবে ২০২৪ সালে দলের সিদ্ধান্তে মেয়র নির্বাচন করেননি। জীবনের কোনো নির্বাচনেই কখনো পরাজিত হননি এই জনপ্রতিনিধি।

সারাজীবন সিলেট মহানগরের রাজনীতি করলেও দলীয় রাজনীতির জটিল মারপ্যাঁচে সিলেট-১ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির টিকিট পাননি তিনি। তফসিল ঘোষণার কিছুদিন আগে দলীয় নির্দেশে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হন আরিফুল হক চৌধুরী।

বলা চলে, সবার শেষে নির্বাচনী মাঠে নেমে সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয় কুড়িয়ে নেন তিনি।

সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আরিফুল হক চৌধুরী পান ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩৪৬ ভোট।

তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মো. জয়নাল আবেদীন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ৬৯ হাজার ৯৭৫ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৭১।

২০০৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন আরিফুল। কাউন্সিলর থাকা অবস্থায়ই তিনি বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়ে সবার মনোযোগ কাড়েন। এ সময় তিনি নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের পরম আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। সেই সূত্রে সিলেটের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন তিনি।

বিএনপি সরকারের পতনের পর ওয়ান-ইলেভেনের পটভূমিতে আরিফুল হক চৌধুরী কারাবরণ করেন। তবে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির বাধা ডিঙিয়ে তিনি ফের নিজের অবস্থান শক্ত করেন।

২০১৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তৎকালীন সিটি মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের বিপরীতে প্রার্থী হন। সিসিকের প্রতিষ্ঠাকালীন মেয়র ও একাধিকবারের নির্বাচিত জনপ্রিয় পৌর মেয়র এবং পরবর্তীতে সিটি মেয়র বদরউদ্দিন কামরানকে হারিয়ে রীতিমতো চমক সৃষ্টি করে সিলেটের মেয়র হন আরিফুল হক।

পরবর্তী নির্বাচনেও তিনি কামরানকে পরাস্ত করে দ্বিতীয় মেয়াদে সিসিক মেয়র হন। মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে আরিফুল আমূল পরিবর্তন আনেন সিলেট নগরে।

তার নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়কগুলো সম্প্রসারণের পাশাপাশি নগরের ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীদের দখলে থাকা ছড়া ও খাল উদ্ধারসহ নানা কাজ করে ব্যাপক প্রশংসিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ২০২৩ সালের সিসিক নির্বাচনে তার প্রার্থী হওয়ার কথা থাকলেও দলের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি মেয়র পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে দলের মনোনয়ন চান আরিফুল হক চৌধুরী। দল এ আসনে না দিলে তিনি অন্য কোনো আসনে নির্বাচন না করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে গত ৫ নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হন।

একেবারে সবার শেষে মাঠে নেমে আরিফুল সিলেটে জামায়াতের অন্যতম শক্তিশালী প্রার্থী জয়নাল আবেদীনকে বিপুল ভোটে হারিয়ে সংসদীয় ভোটের মাঠেও চমক দেখান।

আরিফুল হক চৌধুরী ১৯৫৯ সালের ২৩ নভেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সফিকুল হক চৌধুরী এবং মা আমিনা খাতুন। তিন সন্তানের জনক আরিফুল হক ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠালগ্নে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। তিনি সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, এরপর সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি, সিলেট জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, সিলেট মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক, জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাবেক বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন কমিটির বিভাগীয় আহ্বায়কসহ সিলেটের নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

নিজের এতদূর আসার পেছনে জনগণের ভালোবাসাকেই সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মনে করেন আরিফুল।

নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, ‘আমি জনগণের সেবক হতে চেয়েছি। জনগণ সবসময় আমার পাশে ছিলেন। যখনই তাদের কাছে গেছি, তারা অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন, আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন।’

তিনি বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দল আমার প্রতি আস্থা রেখেছে, যা আমাকে সবসময় শক্তি যুগিয়েছে। আজ আমি যতটুকু হতে পেরেছি, তার পেছনে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব আমার দল ও জনগণের। তাদের কাছে আমি আজীবন ঋণী।’