ময়মনসিংহে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমার প্রবণতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী কমেছে এক লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ জন।
একইসাথে বিপুলসংখ্যক প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য, সহকারী শিক্ষক সঙ্কট, জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ভবন ও নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার মতো নানা সমস্যা শিক্ষাব্যবস্থাকে নাজুক করে তুলেছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহের ১৩ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে দুই হাজার ১৪০টি। ২০২৫ সালে এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮ জন। চলতি ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে চার লাখ ২৫ হাজার ৮২২ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে এক লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ জন।
শিক্ষার্থীদের কেউ যাচ্ছে কাজে, কেউ মাদরাসায়
তারাকান্দা উপজেলার পিঠাসূতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আবু রায়হান মে মাস পর্যন্ত নিয়মিত বিদ্যালয়ে গেলেও জুন থেকে আর স্কুলে আসছে না। খোঁজ নিয়ে শিক্ষকরা জানতে পারেন, সে ঢাকায় একটি দরজির দোকানে কাজ নিয়েছে। রায়হানের বাবা দিনমজুর। সংসারে অভাবের কারণে ছেলেকে ঢাকায় কাজে পাঠানো হয়েছে। তার মা জানান, দুই বছর সেখানে থেকে কাজ শিখবে।
একই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া আক্তারও দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে না। তাকে গ্রামের একটি কওমি মাদরাসায় ভর্তি করিয়েছে পরিবার।
বিদ্যালয়টিতে কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী ১০৪ জন। অথচ ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৫০। শিক্ষকদের ভাষ্য, দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের একটি অংশ কাজের সন্ধানে পরিবারের সাথে ঢাকায় চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে অনেকে সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন, বেসরকারি বিদ্যালয় কিংবা মাদরাসায় ভর্তি করাচ্ছেন।
ঝরে পড়ায় শীর্ষে গফরগাঁও
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ময়মনসিংহে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ঝরে পড়ছে গফরগাঁও উপজেলায়— প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে তারাকান্দা, যেখানে ঝরে পড়ার হার ৪ শতাংশ।
গফরগাঁওয়ে ২০২০ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৬০ হাজার ৮১৫ জন। চলতি বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৩৫ হাজার ২৭ জনে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিভাবকদের সাথে বিদ্যালয়ের যোগাযোগ কমে যাওয়া, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের অল্প বয়সে কাজে যুক্ত হওয়া এবং মাদরাসা ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী স্থানান্তর ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের ২০২৪ সালের শুমারি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ময়মনসিংহসহ কয়েকটি বিভাগে ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক বেশি।
শিক্ষক সঙ্কট
ময়মনসিংহের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সবচেয়ে বড় সঙ্কটগুলোর একটি হলো শিক্ষক সঙ্কট। জেলার এক হাজার ২৪২টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১১ হাজার ৯০২টি। এর মধ্যে কর্মরত ১১ হাজার ৪৯ জন। শূন্য রয়েছে ৮৫৩টি পদ।
সদর উপজেলার পয়েস্তিরচর তারাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র দু’জন। ফলে একইসাথে একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে হচ্ছে শিক্ষকদের। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে ১১২ জন। ২০১৮ সালে ছিল ২২৩ জন।
মুক্তাগাছা উপজেলার গোলাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ছয়টি হলেও কর্মরত মাত্র দু’জন। ২০১৮ সালে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক বদলি হওয়ার পর নতুন কোনো প্রধান শিক্ষক যোগ দেননি।
একই উপজেলার বিন্নাকুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও সাতটি শিক্ষকের পদের বিপরীতে কর্মরত চারজন।
জরাজীর্ণ অবকাঠামো ১৮৭ বিদ্যালয়ে
শিক্ষার্থী সঙ্কটের পাশাপাশি অবকাঠামোগত সমস্যাও প্রকট। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহে এখনো ২৭টি বিদ্যালয়ে টিনশেড ভবনে পাঠদান চলছে। জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ভবনের সংখ্যা ১৮৭টি।
সদর উপজেলার ঝাপারকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এর একটি উদাহরণ। নদীভাঙনে পুরোনো ভবন বিলীন হওয়ার পর ২০১৯ সালে নির্মিত টিনশেড ভবনে চলছে পাঠদান। ২০১৭ সালে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী ছিল ২৪০ জন। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০৭ জনে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, টিনের ঘরে প্রচণ্ড গরমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক শিশু বিদ্যালয়ে না গিয়ে মাছ ধরা কিংবা কৃষিকাজে চলে যায়।
পাঁচ বছরে শিক্ষার্থীর সংখ্যায় বড় ওঠা-নামা
ময়মনসিংহে সরকারি প্রাথমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত কয়েক বছরেও স্থির ছিল না। ২০২১ সালে শিক্ষার্থী ছিল প্রায় পাঁচ লাখ ৪৮ হাজার। ২০২২ সালে তা কমে চার লাখ ২৭ হাজারে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালে বেড়ে হয় চার লাখ ৬৯ হাজার এবং ২০২৪ সালে চার লাখ ৬৬ হাজার। ২০২৫ সালে হঠাৎ বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮ জন। তবে এক বছর পরই তা কমে চার লাখ ২৫ হাজার ৮২২ জনে নেমেছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বড় ধরনের ওঠা-নামার পেছনে শিক্ষার্থী স্থানান্তর, তথ্য হালনাগাদ, ঝরে পড়া ও বিভিন্ন ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী চলে যাওয়ার বিষয়গুলো থাকতে পারে। তবে এক বছরে এক লাখের বেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়াকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: শফিকুল ইসলাম বলেন, অভিভাবকদের একটি বড় অংশ এখন সন্তানদের মাদরাসা, ইবতেদায়ি মাদরাসা, কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন। এ কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে।
তিনি বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে এ প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে। করোনার সময় সরকারি বিদ্যালয় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও অনেক বেসরকারি বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনে পাঠদান চলেছে। তখন কিছু শিক্ষার্থী অন্য ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যায়।
উদ্বেগ বাড়ছে
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়া শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে পুরো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায়। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা বিদ্যালয় ছেড়ে কাজে যুক্ত হলে তাদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আবার মাদরাসা বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী স্থানান্তর হলেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাস্তব চিত্র ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থী ধরে রাখতে বিদ্যালয়ে নিয়মিত হোম ভিজিট, অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ, আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষক সঙ্কট দূর করা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যথায় একদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী হারাবে, অন্যদিকে ঝরে পড়া শিশুদের একটি অংশ অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে ঢুকে পড়বে। ফলে ময়মনসিংহে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষায় এক বছরে এক লাখের বেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার ঘটনাটি কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাজীবন নিয়ে একটি বড় সতর্কবার্তাও।



