সংসার টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করতেন পোশাক শ্রমিক মিম আক্তার (২৮)। অভাবের সংসারে নিজের কষ্টার্জিত বেতনের সামান্য কিছু জমানো টাকা দিয়ে একটু ওষুধ কিনবেন—এটাই ছিল তার সাধ্যের বাইরে থাকা এক ছোট চাওয়া। কিন্তু সেই টাকাটুকুও যখন জুয়ার নেশায় অন্ধ হয়ে কেড়ে নেন স্বামী আলম হোসেন (২৯), তখন প্রতিবাদ করার অপরাধে জীবন দিতে হলো এই তরুণী গৃহবধূকে।
গাজীপুর মহানগরীর বাসন থানার পালেরপাড়া এলাকায় ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধই নয়, বরং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া জুয়া ও নৈতিক অবক্ষয়ের এক ভয়ংকর চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
যেখানে ঘাম ঝরে, সেখানে নেশার থাবা
নিহত মিম আক্তার ও অভিযুক্ত আলম হোসেন দম্পতির একটি ছোট্ট শিশুসন্তান রয়েছে, যার নাম মো: মেরাজ (৩)। অভাবের সংসারে স্বামী পেশায় অটোরিকশাচালক হলেও কোমরের হাড়ের সমস্যার অজুহাতে ঠিকমতো কাজ করতেন না। উল্টো জুয়ার নেশায় আসক্ত হয়ে তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন সর্বনাশা পথে।
গত ২৫ জুলাই মিম তার কষ্টের জমানো ৫ হাজার টাকা ঘরের ড্রয়ারে রেখেছিলেন। ২৭ জুলাই রাতে ওষুধ কেনার জন্য ড্রয়ারে হাত দিয়ে টাকা না পেয়ে স্বামী আলমকে জিজ্ঞাসা করেন। নির্লজ্জের মতো আলম স্বীকার করেন যে, স্ত্রীর ঘাম ঝরানো সেই টাকা দিয়ে তিনি জুয়া খেলে সব শেষ করে ফেলেছেন। একজন খেটে খাওয়া নারীর মুখের গ্রাস ও ওষুধের টাকা কেড়ে নিয়ে জুয়ার বোর্ডে ওড়ানোর এই নিষ্ঠুরতাই ডেকে আনে নরকীয় তাণ্ডব। প্রতিবাদ করায় স্ত্রীর ওপর নেমে আসে অকথ্য শারীরিক নির্যাতন।
ভালোবাসার ঘর যখন বধ্যভূমি
যাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা ছিল, তারাই হয়ে ওঠেন ঘাতক। গত ২৮ জুলাই গভীর রাতে (রাত ৩টা থেকে ৪টার মধ্যবর্তী সময়ে) স্বামী আলম হোসেন ও তার সহযোগীরা ধারালো দা দিয়ে ঘুমন্ত স্ত্রীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। মাথার খুলি, কপাল, মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে বুকের ডান স্তন ও পেটে উপর্যুপরি কুপিয়ে এবং গলা কেটে নিথর করে দেয়া হয় মিমকে। যে হাতের ছোঁয়া ও ভালোবাসায় শিশু মেরাজের বেড়ে ওঠার কথা ছিল, সেই মায়ের নিথর দেহ আজ মর্গে। পরিবারের অসচেতনতা, নৈতিক মূল্যবোধের অভাব এবং জুয়ার মতো সামাজিক ব্যাধি কীভাবে একটি শিশুকে মা-হারা আর একটি মায়ের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিতে পারে, মিম তার এক নির্মম বলি।
দ্রুততম সময়ে অপরাধীর ঠিকানায় পিবিআই
এই লোমহর্ষক ঘটনার পর মাত্র দুই দিনের মধ্যে পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তারের তত্ত্বাবধানে এবং পরিদর্শক মো: রফিকুল ইসলাম জামানের নেতৃত্বে প্রধান অভিযুক্ত আলম হোসেনকে বরিশাল লঞ্চঘাট এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই তৎপরতা কিছুটা স্বস্তি আনলেও, সমাজ থেকে এই নৈতিক পতন ও অপরাধের শেকড় উপড়ে ফেলতে না পারলে এমন মর্মান্তিক পরিণতি হয়তো থামানো যাবে না।
প্রতিটি সচেতন মানুষের মনে প্রশ্ন, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের চেয়েও কি জুয়ার নেশা বড় হয়ে গেল? মিম আক্তারের এই অকালমৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, পারিবারিক সহিংসতা এবং জুয়া নামের সামাজিক ক্যানসারকে সমাজ থেকে এখনই বয়কট না করলে আরও কত মায়ের বুক এভাবে খালি হবে।



