অশ্রুসিক্ত আনন্দ, ২১ বছর পর ফিরল হারানো ছেলে

মাত্র ১৭ বছর বয়সে আলী আক্তার ঢাকার জুরাইনে খালার বাসায় বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে-ই ছিল সবার বড়।

মনিরুজ্জামান সুমন, দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)

Location :

Chuadanga
আলী আক্তার ও তার পরিবার
আলী আক্তার ও তার পরিবার |নয়া দিগন্ত

ভোলা জেলার রতনপুর গ্রামের শিবপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মো: ফারুক হোসেনের জীবনে যেন নতুন সূর্যোদয় এসেছে। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা শূন্যতা, না-পাওয়ার হাহাকার আর অজানা আশঙ্কার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ফিরল তার হারিয়ে যাওয়া প্রতিবন্ধী ছেলে আলী আক্তার (৩৮)।

ঘটনাটি অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। প্রায় ২১ বছর আগে, মাত্র ১৭ বছর বয়সে আলী আক্তার ঢাকার জুরাইনে খালার বাসায় বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে-ই ছিল সবার বড়, পরিবারের আশা-ভরসার কেন্দ্রবিন্দু। হঠাৎ করে বড় ছেলের এমন নিখোঁজ হয়ে যাওয়া পুরো পরিবারকে ভেঙে দেয়।

সেই থেকেই শুরু হয় এক পিতার নিরন্তর খোঁজ। ঢাকা শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা কোথাও বাদ রাখেননি ফারুক হোসেন। মাইকিং করেছেন, মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, কিন্তু ছেলের কোনো খোঁজ পাননি। ধীরে ধীরে নিরাশ হয়ে পড়েন তিনি ও ছেলের মা বিবি মরিয়ম। তবুও বুকের গভীরে একফোটা আশা জ্বলেই ছিল।

সময়ের স্রোতে কেটে যায় দুই দশকেরও বেশি সময়। হঠাৎ একদিন সেই আশার প্রদীপ জ্বলে ওঠে নতুন করে। ফারুক হোসেনের জামাইয়ের বাবা (বিয়াই) চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার মদনা-পারকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন থেকে ফোন করে জানান তার চেহারার সাথে মিল রয়েছে এমন এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ভবঘুরে হিসেবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খবর পেয়ে ভোলা থেকে ছুটে যান ফারুক হোসেন। বহু বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটে সেই মুহূর্তে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটিই যে তার হারিয়ে যাওয়া ছেলে, তা চিনতে একটুও ভুল হয়নি তার। পিতার বুক ভেঙে কান্না ঝরে পড়ে, আর ছেলের ফিরে পাওয়ার আনন্দে ভরে ওঠে চারপাশ।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২০-২১ বছর ধরে আলী আক্তার ওই এলাকায় ভবঘুরে অবস্থায় বসবাস করছিলেন। মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে ঠিকমতো কথা বলতে পারতেন না। গ্রামের মানুষই তাকে খাবার দিতেন, যা পেতেন তাই খেতেন। একটি চায়ের দোকানেই ছিল তার রাত কাটানোর ঠিকানা।

পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আজির রহমান বলেন, ‘সকালে খবর পেয়ে আমরা সেখানে যাই। বাবা-ছেলের চেহারার মিল দেখে নিশ্চিত হয়ে আমরা ছেলেটিকে তার বাবার হাতে তুলে দিই। এমন মানবিক কাজ করতে পেরে আমরা সত্যিই আনন্দিত।’

দর্শনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান জানান, বিষয়টি আমি জেনেছি। ছেলেটিকে নিয়ে কোনো জিডি বা মামলা না থাকায় এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে নিশ্চিত হওয়ার পর তার বাবার কাছেই হস্তান্তর করা হয়েছে।

ছেলেকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি। আমার ছেলেকে ফিরে পাবো এই আশা কখনো ছাড়িনি। আজ আল্লাহ আমার সেই দোয়া কবুল করেছেন। যারা এতদিন আমার ছেলেকে দেখাশোনা করেছেন, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’

এই গল্প শুধু একটি পরিবারের পুনর্মিলন নয়, এটি এক পিতার অবিচল ভালোবাসা, দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে ১৭ বছর বয়সে হারিয়ে যাওয়া পরিবারের বড় ছেলের ফিরে আসা যেন নতুন করে জীবন ফিরে পাওয়ার সমান।