সীমান্তে ১৮ দিনে ৩১২ জনকে পুশ ইন

ভারতীয় নাগরিক ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা

পুশ ইন ঠেকাতে কুটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সিলেটের আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

এমজেএইচ জামিল, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
ভারতীয় নাগরিক ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা
ভারতীয় নাগরিক ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা |নয়া দিগন্ত

কড়া নিরাপত্তা ও নজরদারি স্বত্তেও সিলেট সীমান্তে পুশইনের ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ। চলতি মে মাসের ১৮দিনে সিলেটের বিভিন্ন সীমান্তে ৩১২ জনকে পুশ ইন করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তাদের বেশিভাগই বাংলাদেশী বলে তাৎক্ষনিকভাবে জানা গেলেও ভারতীয় নাগরিক ও রুহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পুশ ইন ঠেকাতে কুটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সিলেটের আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

জানা গেছে, গত কয়েক মাস থেকে সিলেট সীমান্তে অব্যাহত পুশ ইনের ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একের পর পুশ ইন অব্যাহত রেখেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। বাংলাদেশী সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি)-এর প্রতিবাদ ও সতর্ক অবস্থান সত্ত্বেও থামছে না পুশ ইন।

গত ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট সীমান্ত দিয়ে নতুন করে আরো ৪০ জনকে পুশ ইন করেছে বিএসএফ। এর মধ্যে সোমবার (২৬ মে) সকাল পৌনে ৮টায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের মতেরবল সীমান্ত এলাকায় পুশ ইনের সময় ২১ জনকে আটক করে বিজিবি। আটককৃতদের মধ্যে সাতজন পুরুষ, ছয়জন মহিলা ও আটজন শিশু রয়েছেন। আটককৃতরা বাংলাদেশী নাগরিক বলে বিজিবি নিশ্চিত করেছে।

এদিকে রোববার (২৫ মে) গভীর রাত থেকে সোমবার (২৬ মে) সকাল পর্যন্ত চুনারুঘাটের কালেঙ্গা সীমান্ত থেকে পুশ ইন করার আরো ১৯ জনকে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

বিজিবির দাবি, বিএসএফ তাদের নিজ সীমান্তে একত্র করে কাঁটাতারের গেট খুলে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচ শিশু, আট নারী ও ছয় পুরুষ আছেন। তারা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক এবং কুড়িগ্রামের বাসিন্দা। তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তরের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সোমবার (২৬ মে) দুপুরে এ তথ্য নিশ্চিত করেন বিজিবি কালেঙ্গা ক্যাম্পের হাবিলদার জাকারিয়া।

তবে এই পুশ ইন কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশীর নাগরিকের পাশাপাশি রোহিঙ্গা এবং ভারতীয়দের ঠেলে দেয়ার শঙ্কা করছেন খোদ বিজিবি কর্তৃপক্ষ। যদিও তারা জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্কতার সহিত পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। কিন্তু মানবিক কারণে বিজিবি পুশ ইন হওয়ার পর কাউকে ফের পুশ ব্যাক করতে পারে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট সীমান্ত দিয়ে একের পর এক শত শত মানুষকে পুশ ইন (জোরপূর্বক ঢুকিয়ে দেয়া) করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। চলতি মাসের ৮ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত ১৮ দিনে মৌলভীবাজার ও সিলেট সীমান্ত দিয়ে ৩১২ জনকে পুশ ইন করা হয়েছে। বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় সিলেট সীমান্তজুড়ে সতর্কতা ও তৎপরতা বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তবুও থামছে না পুশ ইন।

এর আগে, রোববার (২৫ মে) সিলেট ও মৌলভীবাজার সীমান্ত দিয়ে বড় ধরনের পুশ ইন অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১৫৩ জনকে পুশ ইন করে বিএসএফ। তাদের বাড়ি দেশের বিভিন্ন জেলায় বলে বিজিবি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শনিবার (২৪ মে) গভীর রাত থেকে রোববার (২৫ মে) সকাল ৮টা পর্যন্ত পুশ ইন করা হয়। তবে বাংলাদেশে প্রবেশের সাথে-সাথেই তাদের আটক করেছে বিজিবি।
এদের মধ্যে বড়লেখার লাতু বিওপি ক্যাম্প আটক করে ৭৯ জন, পাল্লাথল বিওপি ক্যাম্প আটক করে ৪২ জন ও নয়াগ্রাম বিওপি ক্যাম্প আটক করে ৩২ জনকে।

বিজিবি জানায়, ঘনজঙ্গল ও বিলের মধ্য দিয়ে তাদের বাংলাদেশে পাঠানো হয়। বিজিবি ৫২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সীমান্তে পুশ ব্যাক বা পুশ ইন এমন একটা পদ্ধতি যেখানে ধরা পড়া ব্যক্তিদের সীমান্তে নিয়ে গিয়ে অন্যদেশের সীমান্তে ঠেলে দেয়া হয়ে থাকে। ভারতের দিক থেকে যেটা পুশ ব্যাক, বাংলাদেশের চোখে সেটাই পুশ ইন। এই প্রক্রিয়ার কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই ভারতে। কিন্তু সম্প্রতি এভাবে শত শত বাংলাদেশীকে সীমান্তে এনে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, সীমান্ত পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় ভারতের মেঘালয়ের পূর্ব জৈন্তিয়া হিলস জেলাসহ তিনটি জেলায় আন্তর্জাতিক সীমান্তজুড়ে রাত্রিকালীন কারফিউ জারি করা হয়েছে। রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করে সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ৫০০ মিটার পর্যন্ত এলাকায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, গবাদিপশু পারাপার, অস্ত্র বা বিপজ্জনক বস্তু বহনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

তবুও থামছে না পুশ ইনের মতো ঘটনা। সম্প্রতি সিলেট সীমান্তজুড়ে আরো বেড়েই চলছে এমন বেআইনি কার্যক্রম।

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ মে সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত দিয়ে ২১ বাংলাদেশীকে পুশ ইন করেছে বিএসএফ। তাদের মধ্যে ১২ জন পুরুষ, চারজন নারী ও পাঁচজন শিশু ছিলেন।
এর আগে, বুধবার (১৪ মে) একই উপজেলার ডোনা সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে আরো ১৬ নারী-পুরুষকে পুশ ইন করা হয়। তাদের মধ্যে আটজন পুরুষ, ছয়জন নারী ও দু’জন শিশু ছিলেন।

বৃহস্পতিবার (২২ মে) মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের মুরইছড়া সীমান্ত দিয়ে শিশুসহ সাত বাংলাদেশীকে পুশ ইন করেছে বিএসএফ। আটকদের মধ্যে ছিলেন দু’জন পুরুষ, দু’জন নারী ও তিন শিশু। তারা সবাই কুড়িগ্রাম জেলার বাসিন্দা।

শুক্রবার (১৬ মে) মৌলভীবাজারের বড়লেখার নিউ পাল্লাথল সীমান্ত এলাকা দিয়ে আরো ১৬ জনকে পুশ ইন করেছে বিএসএফ। এর মধ্যে ১৪ জন নারী ও দু’জন পুরুষ ছিলেন।

বুধবার (১৪ মে) মৌলভীবাজারের বড়লেখার পাল্লাতল সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ৪৪ জনকে পুশ ইন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ জন পুরুষ, ১৮ জন নারী ও ১৩ শিশু ছিলেন।

এর আগে, বৃহস্পতিবার (৮ মে) মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে আরো ১৫ জনকে পুশ ইন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নয়জন পুরুষ, তিনজন নারী ও তিনজন শিশু ছিলেন।

এদিকে, সীমান্তে পুশ ব্যাক ঠেকাতে তৎপর বিজিবি। গোয়াইনঘাটের খাসিয়া হাওড়, তামাবিল, সোনাটিলা, সংগ্রামপুঞ্জি, পান্তুমাই, বিছনাকান্দিসহ ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টে টহল জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি।

বিজিবি ৫২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী হাসান, সীমান্ত এলাকার কিছু অংশ পাহাড়ি আবার কিছু এলাকায় জলাভূমি বিল থাকায় জিরো পয়েন্ট থেকে নজরদারি করা কঠিন। বিএসএফ তাদের এলাকায় স্থাপিত নিরাপত্তা লাইট বন্ধ করে দিয়ে মানুষদের সীমান্তের এপারে ঠেলে দেয়। পরে টহল বিজিবি তাদের আটক করে। বিজিবির হাতে আটকের পর পরিচয় যাচাই করে বাংলাদেশী নাগরিক বলে মানবিক দিক বিবেচনায় তাদের পরিবারের কাছে পাঠানোর জন্য পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সার্বিক বিষয়ে সিলেট জেলা বারের সাবেক সভাপতি ও সিলেট জজকোর্টের সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট এমাদুল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘পুশ ইন কিংবা পুশ ব্যাক দু’টিই বেআইনি এবং মানবাধিকার পরিপন্থী। সিলেট বিভাগ হচ্ছে সীমান্ত ঘেরা অঞ্চল। এই অঞ্চলে ভারত যেভাবে পুশ ইনের মাধ্যমে প্রতিদিন শত শত মানুষকে জোর করে ঠেলে দিচ্ছে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মতো নয়। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ক শুধু কড়া বিবৃতি নয়, কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনের আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার সংগঠনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় সীমান্তে উভয় দেশের মানুষ বন্দী হয়েছে। তখন দু’টি দেশ তাদের মানুষকে আইনিভাবে হস্থান্তর ও গ্রহণ করেছে। এটাই সঠিক পদ্ধতি। বাংলাদেশী অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশ করলে ওই দেশের আইন অনুযায়ী বাংলাদেশী দূতাবাসকে বিষয়টি অবহিত করতে হবে। দূতাবাসের মাধ্যমেই তাদেরকে দেশে পাঠাতে হবে। এভাবে বাংলাদেশী বলে শত শত মানুষকে পুশ ইন করা কোনোভাবেই সঠিক নয়। বিষয়টি উভয় দেশের জন্য বিপজ্জনক। তাই এখনি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউছ দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমাদের দেশ যেমন আইন-কানুন মেনে চলে, তেমনি বন্ধু রাষ্ট্র ভারতও আইন কানুন মেনে চলে। তাই আমাদের কোনো নাগরিক তাদের দেশে গেলে আইনিভাবে হস্তান্তর করতে হবে। তা না করে ভারত যেভাবে জোরপূর্বক পুশ ইন করছে তা অনাকাঙ্খিত এবং দুই দেশের ভাবমূর্তি ও সম্পর্কে জন্য ক্ষতিকর। এ ব্যাপারে আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সতর্ক থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারকেও বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সবকিছুর উর্ধ্বে।’

জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সিলেট অঞ্চলের পরিচালক অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘জামায়াত কেন্দ্রীয়ভাবে পুশ ইন বন্ধ করার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এই ধরনের আইন ও মানবাধিকার পরিপন্থী দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল।’

সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল মো: নাজমুল হক দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ৪৮ বিজিবির আওতাধীন এলাকা দিয়ে এখনো পুশ ইন, পুশ ব্যাকের ঘটনা ঘটেনি। তবুও সীমান্তজুড়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে এ বিষয়ে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। যাতে সীমান্তে এ ধরনের অপৎপরতার খবর পেলেই বিজিবিকে জানাতে পারেন।