পদ্মা সেতুতে টোল আদায়ের অনন্য মাইলফলক

যান পারাপার ২,৩৪,১৬,২,৪১টি; আয় ৩,০০১,৭৫,০৬,১৫০ টাকা

পদ্মা সেতু দিয়ে দিন দিন যানচলাচল বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাথে সাথে বাড়ছে সেতুর টোল আদায়। ইতোমধ্যে টোল আদায়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে পদ্মা সেতু।

পদ্মা সেতুতে টোল আদায়ের অনন্য মাইলফলক
পদ্মা সেতুতে টোল আদায়ের অনন্য মাইলফলক |সংগৃহীত

লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) সংবাদদাতা

পদ্মা সেতু দিয়ে দিন দিন যানচলাচল বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাথে সাথে বাড়ছে সেতুর টোল আদায়। ইতোমধ্যে টোল আদায়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে পদ্মা সেতু।

উদ্বোধনের পর থেকে মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) পর্যন্ত সেতু থেকে সংগৃহীত মোট টোলের পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

মঙ্গলবার বিকেলে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মাসুদ রানা শিকদারের পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধন হয় পদ্মা সেতু। সেতুটি দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সাথে রাজধানী ঢাকার সড়ক সংযোগ স্থাপন করেছে। সেতুটি যাতায়াতের সময় সাশ্রয় করেছে। একইসাথে সৃষ্টি করেছে অনেক কর্মসংস্থান। সেজন্য দিন দিন এই সেতু দিয়ে যান পারাপারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে বৃদ্ধি পাচ্ছে রাজস্ব আয়ও। বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং শিল্পজাত পণ্য পরিবহনে সেতুটি এনেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

সেতু কর্তৃপক্ষ আরো জানায়, পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে (মাওয়া ও জাজিরা) স্থাপিত অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন বা ইটিসি পদ্ধতি টোল আদায় কার্যক্রমকে বেগবান করে। এতে যানবাহনকে টোল প্লাজায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। ফলে সময় বাঁচে। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (আরএফআইডি) কার্ডের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল আদায়ের ফলে যাতায়াত আরো দ্রুত ও সহজতর হয়েছে। জনগণের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা এবং ডিজিটাল টোল সিস্টেমের আধুনিকায়নের ফলেই এই সাফল্য দ্রুত অর্জন সম্ভব হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান-এর বিশেষ দিক-নির্দেশনায় এবং সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ-এর সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানের ফলেই এই অর্জন সম্ভব হয়েছে বলে সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

পদ্মা সেতুর টোল আদায়ের এ মাইলফলক অর্জনের জন্য গাড়ির মালিক, চালক, শ্রমিক, সেতুর দুই পাড়ের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সেতুর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট অপারেটর, সাইট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সেতু সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনকে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালকের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়েছে।

এদিকে পদ্মা সেতুতে টোল আদায়ে ৩ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম এবং ট্রাফিক পরিসংখ্যানের তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় নয়া দিগন্তকে মঙ্গলবার বিকেলে জানান, সেতু চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ২ কোটি ৩৪ লাখ ১৬ হাজার ২৪১টি যানবহন পারাপার করেছে। এতে সর্বমোট (ক্যাশ, ক্রেডিট ও ইটিসিএসসহ) ৩ হাজার ১ কোটি ৭৫ লাখ ৬ হাজার ১৫০ টাকা টোল আদায় হয়েছে। এর মধ্যে ইটিসিএস থেকে আয় হয়েছে ২ কোটি ৫৪ লক্ষ ৫৫ হাজার ৯০০ টাকা।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের টোল রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ীছে, সেতু চালুর পরদিন থেকে গেলো বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত গত সাড়ে তিন বছরে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেমসহ সেতুর উভয় প্রান্ত মিলে সর্বমোট টোল আদায় হয় ২ হাজার ৯৩৬ কোটি ১৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। আর এতে মোট যানবাহন পারপার হয় ২ কোটি ২৯ লাখ ২২ হাজার ৬৭৫টি।

সেতু চালুর প্রথম বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২৩ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত মোট ৫৬ লাখ ৯৪ হাজার ৮৯৯টি যানবাহন পার হয়। টোল আদায় হয় মোট ৭৯৮ কোটি ৬০ লাখ ৯৩ হাজার ৭০০ টাকা।

দ্বিতীয় বছর ২০২৩ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২৪ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত মোট যানবাহন পারাপার হয়েছে ৬৮ লাখ ১ হাজার ৩৭৪টি। এ সময় মোট টোল আদায় হয়েছে ৮৫০ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩৫০ টাকা টোল আদায়ে সক্ষম হয় পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ।

সেতু চালুর তৃতীয় বছরে অর্থাৎ ২০২৪ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত এক বছরে মোট যানবাহন পারাপার হয়েছে ৬৯ লাখ ৭৭ হাজার ৩৩৪টি। এ সময় রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮৫৮ কোটি ৮৭ লাখ ২ হাজার ৫৫০ টাকা।

এতে ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধনের পরদিন ২৬ জুন থেকে গেলো বছরের ২৪ জুন পর্যন্ত সেতুর প্রথম তিন বছরে টোল প্লাজায় সর্বমোট টোল আদায় হয়েছিল ২ হাজার ৫০৭ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৬০০ টাকা। এদিন পর্যন্ত ক্রেডিট যানবাহনসহ সর্বমোট পারপার হয়েছিল ১ কোটি ৯৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬০৭টি যানবাহন।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ২৫ জুন প্রমত্তা পদ্মার বুকে চালু হয় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দেশের অন্যতম বৃহৎ পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প। প্রকল্পের সর্বশেষ প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ব্যয় সঙ্কোচন নীতি অবলম্বন করে সর্বশেষ চূড়ান্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। বাকি ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দিয়েছে অর্থ বিভাগ। ঋণ চুক্তি অনুযায়ী ১ শতাংশ সুদসহ ৩৫ বছরে ঋণের টাকা ফেরত দেবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।

ঋণ পরিশোধের শিডিউল অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরে চারটি কিস্তি করে সর্বমোট ১৪০টি কিস্তিতে সুদ-আসল পরিশোধ করতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে সেতুটির ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে এবং এ ঋণ পরিশোধের জন্য ২০৫৬-৫৭ অর্থবছর পর্যন্ত সময় পাবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।