চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় চলতি মৌসুমে বোরোর ভালো ফলন হয়েছে, তবে প্রতিকূল আবহাওয়া, তীব্র শ্রমিক সঙ্কট এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় বর্তমানে কৃষকরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। মাঠে পাকা ধান দ্রুত ঘরে তুলতে না পারায় অনেক কৃষকের মধ্যে উৎকণ্ঠা ও হতাশার ছাপ দেখা দিয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বোরো ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ হাজার ৪৫ হেক্টর, যা পুরোপুরি অর্জিত হয়েছে।
গত শুক্রবার সকালে সরেজমিনে মাঠ ও বিল ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। কৃষকরা ধানের আঁটি, পাঁজা বেঁধে বাঁকে ও ভ্যানে করে ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ জমিতে সোনালী ধান দুলছে। তবে কিছু এলাকায় ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির কারণে পাকা ধান মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।
স্থানীয় একাধিক কৃষকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর বোরো ধানের ফলন খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টিতে ধানের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একইসাথে ধান কাটার শ্রমিক সঙ্কট এবং বাড়তি মজুরি কৃষকদের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে একজন ধান কাটার শ্রমিককে প্রতিদিন এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হচ্ছে। তবুও অনেক সময় চাহিদা অনুযায়ী শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে ইসলামাবাদ ইউনিয়নের কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, ৪২ শতকের (২০ কাঠা) ৩ বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছি। ফলন খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু ধান কাটা শ্রমিকের মজুরি অনেক বেশি। একজন শ্রমিক দিনে সর্বোচ্চ ৭ ঘণ্টা কাজ করে, তবু এক হাজার টাকা দিতে হয়। আবহাওয়া খারাপ হলে মজুরি আরো বেড়ে যায়।
তিনি আরো বলেন, ধানের ফলন ভালো হওয়ায় প্রতি কাঠায় প্রায় এক মণ করে ধান হবে। একজন শ্রমিক প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ কাঠা জমির ধান কাটতে পারে। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ ধান ৯০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ধানের দাম না বাড়লে কৃষকরা লোকসানে পড়বে।
উপজেলার ফরাজী কান্দি ইউনিয়নের কৃষক নুর হোসেন বলেন, মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ফসল ফলাই, কিন্তু কপালটাই মন্দ; একদিকে বৈরী আবহাওয়ায় অসময়ের বৃষ্টি আর গরমে ফসল নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কামলা (শ্রমিক) নেই; তীব্র শ্রমিক সঙ্কটে মাঠের ফসল মাঠেই পচে যাচ্ছে।সব কষ্ট সয়ে যখন ফসল বাজারে তুলি, তখন দেখি বাজারমূল্যের ধস। যে দামে বিক্রি করি, তাতে সার আর বীজের খরচই ওঠে না। আমরা দিনরাত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল উৎপাদন করি, অথচ ন্যায্য দাম না পেয়ে আজ আমাদের পথে বসার দশা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল মোহাম্মদ আলী বলেন, চলতি অর্থবছরে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে আশা করছি। এরই মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে ধানকাটা শ্রমিকের সঙ্কট ও মজুরি বেশি হওয়ায় কৃষকরা একটু সমস্যায় পড়েছেন। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি।
তিনি কৃষকদের উদ্দেশে বলেন, সরকারিভাবে হোক বেসরকারিভাবে হোক যেখানে তারা বেশি দাম পাবে সেখানে বিক্রি করবে। বাইরে দাম কম হলে সরকারিভাবে বিক্রি করার জন্য তাদের ধান প্রস্তুত করতে হবে। যাতে করে মধ্যসত্বভোগীরা লাভবান হতে না পারে।



