ঝালকাঠি শহরের বাসন্ডা এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা আমির হোসেন আমু প্রতিষ্ঠিত ‘আকলিমা-মোয়াজ্জেম হোসেন ডিগ্রি কলেজ’কে বিশ্ববিদ্যালয় দেখিয়ে ৭৭ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে লোপাট করা হয়েছে। প্রকল্প হিসেবে দেখানো হয়েছে নামে-বেনামে বিভিন্ন কাজ। যা আদৌ বাস্তবায়ন করা হয়নি। ঝালকাঠি জেলা পরিষদ থেকে ক্ষমতার প্রভাবে এসব বরাদ্দ নেয়া হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সরদার মো: শাহ আলম ভুয়া প্রকল্পে ৭৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেন। আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু ২০১২ সালে তার মা-বাবার নামে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, শুরু থেকেই জমি দখলসহ নানা বিতর্কে জড়িয়ে থাকা এই কলেজটির নামে ঝালকাঠি জেলা পরিষদ থেকে বারবার উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে রয়েছে গুরুতর গড়মিল। বরাদ্দ সংক্রান্ত নথিপত্রে একাধিকবার কলেজটির নাম পরিবর্তন করে কখনো ‘আকলিমা মোয়াজ্জেম হোসেন ডিগ্রি কলেজ’ কখনো ‘আকলিমা মোয়াজ্জেম হোসেন কলেজ’ আবার কখনো ‘আকলিমা মোয়াজ্জেম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চতর প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই এমনটি করা হয়েছে।
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে কলেজটির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে প্রায় ৭৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে এডিবির বিশেষ বরাদ্দ থেকে মসজিদ উন্নয়নের নামে ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে সরেজমিনে গিয়ে কলেজ প্রাঙ্গণে কোনো মসজিদ বা নামাজের স্থান পাওয়া যায়নি।
এছাড়া বাকি প্রায় ৬২ লাখ টাকা বালু ভরাট, বাউন্ডারি ওয়াল, সাইকেল স্ট্যান্ড ও শহীদ মিনার নির্মাণের নামে ব্যয় দেখানো হয়েছে।
২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ‘গেইট ও বাউন্ডারি ওয়াল’ নির্মাণে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। পরবর্তীতে একই প্রকল্পকে ‘সীমানা প্রাচীর’ উল্লেখ করে আবারো অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
২০১৯-২০ অর্থবছরে ‘ঝালকাঠি আকলিমা মোয়াজ্জেম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’ নামে ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়, যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
একই সময়ে শহীদ মিনার নির্মাণে ৪ লাখ টাকা উত্তোলন করা হলেও অডিটে সেটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পরে ২০২২ সালে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়।
এছাড়া মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের শেড নির্মাণে ৪ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও সরেজমিনে দেখা গেছে, সেখানে একটি সাধারণ খোলা কক্ষ তৈরি করা হয়েছে, যার টিনের ছাউনি দেয়া হয়েছে সরকারি ত্রাণের ঢেউটিন দিয়ে।
২০২০-২১ অর্থবছরেও মাঠ ভরাট ও ডোবা ভরাটের নামে পুনরায় অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। একই সময়ে ‘আকলিমা মোয়াজ্জেম হোসেন জামে মসজিদ’ উন্নয়নের নামে আরো ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও জেলার কোথাও ওই নামে কোনো মসজিদের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন জেলা পরিষদের তৎকালীন এক কর্মকর্তা।
জেলা পরিষদের একাধিক নথি স্টোররুম থেকে গায়েব হওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা, যা পুরো বিষয়টিকে আরো রহস্যজনক করে তুলেছে।
স্থানীয় শিক্ষানুরাগীরা মনে করছেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিকে খুশি রাখতেই তৎকালীন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, প্রকৌশলী ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে এ ধরনের অনিয়ম হয়েছে।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক অ্যাডভোকেট মো: শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এখন থেকে কোনো ভুয়া প্রকল্প বা ভৌতিক বিল বিল পাশ করা হবে না। সকল প্রকল্প যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেয়া হবে।’
এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহল।



