সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন বাবা-ছেলেসহ চারজন শ্রীলঙ্কান নাগরিক। হঠাৎই বিকল হয়ে যায় তাদের মাছ ধরার ট্রলার! সেখান থেকে দু’জন অন্য ট্রলারে ফিরে গেলেও বিকল ট্রলারটি রক্ষা করতে রয়ে যায় বাবা-ছেলে। টানা ৩৬ দিন ট্রলারটি সমুদ্রে ভেসে ছিল! গত বুধবার বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ট্রলারটি ভাসতে ভাসতে চলে আসে। তখন বাংলাদেশী একটি মাছ ধরা ট্রলার তাদের দেখতে পায়।
ওই ট্রলারটি কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের জিয়াউর রহমানের। তিনিসহ ওই ট্রলারটিতে মোট আটজন জেলে ছিলেন।
জিয়াউর বিবিসি বাংলাকে জানান, গত বুধবার রাতে ওই ট্রলারটিকে দূর থেকে ভাসতে দেখছিলেন। একটু একটু করে যখন কাছে যান, তখন তিনি দেখতে পান ট্রলারটিতে দু’জন ভিনদেশী নাগরিক।
‘কাছে গিয়ে দেখলাম দু’জন মানুষ বসা থেকে উঠতে পর্যন্ত পারতেছে না। তাদের কোনো কথাই বুঝতেছিলাম না। তারা হাতের ইশারায় সাহায্য চাচ্ছিল। আর শুধু বলছিল- শ্রীলঙ্কান, শ্রীলঙ্কান।’
পরে তাদের সেখান থেকে মাছ ধরার ট্রলারে করে উপকূলে নিয়ে আসেন জিয়াউর।
শ্রীলঙ্কার ওই দুই নাগরিক হলেন এস এইচ চামিন্দা ও তার ছেলে সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং। তাদের বাড়ি শ্রীলঙ্কার ডেভিনুওয়ারা এলাকার রুরাল হসপিটাল রোডে।
সমুদ্রে ভাসতে থাকা ওই দু’জন শ্রীলঙ্কান জেলে, তাদের পরিবার এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সাথেও কথা বলেছে বিবিসি বাংলা।
সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং- এর মেয়ে শ্রীলঙ্কা থেকে বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন উদ্ধারকৃত দু’জন নাগরিক সম্পর্কে তার বাবা ও দাদা। তাদের উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশের জেলে ও পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
বর্তমানে ওই দু’জন জেলে কক্সবাজারেই আছেন। আর তাদের বিকল মাছ ধরার সেই ট্রলারটিও রাখা হয়েছে পুলিশি হেফাজতে। তাদের শিগগিরই ঢাকায় পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কক্সবাজার মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি মো: আবদুস সুলতান জানান, এ নিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত শ্রীলঙ্কান হাইকমিশনার তার সাথে কথা বলেছেন। ওই দু’জন জেলেকে দেশে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে এরই মধ্যে প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।
ভাসতে থাকা ট্রলারটি যেভাবে উদ্ধার
বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে প্রায় ১৩ শ’ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে শ্রীলঙ্কার অবস্থান। দক্ষিণ এশিয়ার কাছাকাছি দেশ দু’টির অবস্থান হলেও সরাসরি জলসীমা নেই দু’টি দেশের মধ্যে।
মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের বাসিন্দা জিয়াউর রহমান বঙ্গোপসাগরে তার ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে বের হয়েছিলেন।
তিনি জানান, গত বুধবার বঙ্গোপসাগরের গুলিরধার এলাকায় একটি মাছ ধরার ট্রলারকে সাগরে ভাসতে দেখে সেই ট্রলারটির কাছাকাছি যান। কাছে গিয়ে তিনি দেখেন ট্রলারটির ইঞ্জিন বিকল। সেখানেই অসুস্থ অবস্থায় বসে আছেন দুই ব্যক্তি।
জিয়াউর বলেন, “কাছে গিয়ে দেখি ওই দু’জন মানুষ বসা থেকে উঠতে পারছিলেন না। তাদের জিজ্ঞেস করলাম তারা কোথা থেকে আসছে। তারা জানালো, তারা শ্রীলঙ্কার। এর বাইরে তাদের আর কোনো ভাষা আমরা বুঝিনি।”
তিনি জানান, ওই দু’জন জেলে তাদের সাহায্যের আকুতি জানান। এক পর্যায়ে ওই দু’জনকে তাদের ট্রলারে উঠিয়ে আনেন তিনি ও তার ট্রলারে থাকা অন্য জেলেরা।
‘তাদের কোনো ভাষাই আমরা বুঝতেছিলাম না। তারা শুধু বার বার দু’টি শব্দ বলছিল, নেভি? কোস্টগার্ড’, যোগ করেন তিনি।
জেলে জিয়াউরের ভাষ্য, শ্রীলঙ্কান ওই দুই জেলে তাদের মাছ ধরার ট্রলারটি হাতছাড়া করতে চাচ্ছিল না। যে কারণে ওই দু’জন জেলেকে ট্রলারে ওঠানোর পর, তাদের মাছ ধরার ট্রলারটি বেঁধেই উপকূলের উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি।
এরপর প্রায় ১৪ ঘণ্টা ট্রলার চালিয়ে ওই দু’জন শ্রীলঙ্কান জেলেকে সাথে নিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল উপকূলে পৌঁছায়।
তারপর কী হলো?
জিয়াউর জানান, ওই দুই জেলেকে নিয়ে বাংলাদেশী ট্রলারটি উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছায়। একটা পর্যায়ে যখন মোবাইলে ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের আওতায় আসে, তখন ওই দুই জেলে শ্রীলঙ্কায় থাকা তাদের পরিবারের একটি ফোন নম্বর দেন তার কাছে।
সেই নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দেয়ার পর বাবা-ছেলে ওই দু’জন জেলে তাদের পরিবারের সাথে কথা বলেন এবং পরিবারের সাথে কথা বলে তারা আশ্বস্তও হন।
বাংলাদেশী জেলে বলেন, এরপর আমরা বিষয়টি স্থানীয় থানা ও কোস্টগার্ডকেও জানাই। পরে ওই দু’জন জেলেকে সাথে করে আমার বাসায় নিয়ে যাই। বাসায় নিয়ে তাদের রাতের খাবার-দাবার দেই। স্থানীয় ডাক্তার ডেকে ডাক্তার দেখাই। ডাক্তার তাদের ওষুধ দেয় সেই ওষুধ তারা খায়।
ওই রাতে স্থানীয় প্রশাসন রাতে ওই দু’জন শ্রীলঙ্কান জেলেকে রাতে ওই বাসাতে রাখার অনুরোধ জানান।
মহেশখালী থানার ওসি মো: আবদুস সুলতান বলেন, ‘গভীর সমুদ্রে আসার পর মূলত তাদের নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে গিয়েছিল। যখন তারা আর ট্রলারটি ঠিক করতে পারেনি তখন সেটি ভাসতে ভাসতে আমাদের এদিকে চলে আসে।’
দোভাষীর মাধ্যমে ওই দু’জন জেলের সাথে কথা বলে ওসি সুলতান জানান, গত জুন মাসের ১৯ তারিখ চারজন শ্রীলঙ্কান জেলে ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে বের হওয়ার পর তাদের নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে গিয়েছিল। পরে সেই নৌকাটি বাংলাদেশী একটি ট্রলারের নজরে আসে।
উদ্ধার হওয়া ওই দুই শ্রীলঙ্কান জেলের বরাত দিয়ে ট্রলার মালিক জানান, সাগরে ভেসে থাকার একপর্যায়ে যখন তাদের খাবার শেষ হয়ে গিয়েছিল, ওই দুই শ্রীলঙ্কান নাগরিক সাগরের কাঁচা মাছ খেতে বাধ্য হয়েছিলেন।
শ্রীলঙ্কায় ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ
ওই দু’জন শ্রীলঙ্কান নাগরিক এক দিন ছিলেন বাংলাদেশী জেলের বাড়িতে। তারপর মহেশখালী থানা থেকে ফোন দিয়ে ওই দু’জনকে থানায় নিয়ে আসার জন্য বলা হয়। শনিবার তাদের দু’জনকে মহেশখালী থানায় নিয়ে যান।
পুলিশ জানায়, ওই দু’জন জেলে তাদের নিজ দেশের ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বুঝেনও না এবং বলতেও পারেন না।
একটা পর্যায়ে পুলিশ কক্সবাজারের একটি হোটেলের দায়িত্বে থাকা একজন শ্রীলঙ্কান নাগরিককে ফোন দিয়ে তাদের থানায় নিয়ে আসেন। যিনি দোভাষী হিসেবে পুরো ঘটনাটি তার কাছ থেকে শোনেন এবং সেটি পুলিশকে ব্যাখ্যা করেন।
একটা পর্যায়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি জানায় বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কান দূতাবাসকে।
মহেশখালী থানার ওসি মো: আবদুস সুলতান বলেন, “খবর পেয়ে শ্রীলঙ্কার অ্যাম্বাসেডর আমাকে ফোন দেন। আমার সাথে কথা বলার পর আমাদের হেফাজতে থাকা ওই দু’জন জেলের সাথে কথা বলেন এবং তাদের আশ্বস্ত করেন যে তাদের দেশে ফিরিয়ে নিবেন।”
পুলিশ জানায়, ওই দু’জন নাগরিককে থানা হেফাজত থেকে সমাজ সেবা অধিদফতরে রাখার জন্য আদালতের মাধ্যমে আবেদন করা হয়েছে। দুয়েকদিনের মধ্যে সমাজ সেবা অধিদফতরের মাধ্যমে তাদের ঢাকায় পাঠানো হবে।
ওসি বলছিলেন, “আমাদের হেফাজতে থাকা অবস্থায় ওই দু’জন জেলের পাসপোর্ট ছবি তুলে আমরা শ্রীলঙ্কান অ্যাম্বাসিতে পাঠিয়েছি। এরপর তাদের নামে পাসপোর্ট কিংবা পাস ইস্যু হবে। ট্রাভেল পাশসহ যাবতীয় কার্যক্রম শেষ হলেই তাদের নিজ দেশে ফেরানো কার্যক্রমটি সম্পন্ন হতে পারে।”
যে নৌকা ছেড়ে যেতে চাননি শ্রীলঙ্কান ওই দুই নাগরিক শেষ পর্যন্ত সেই নৌকাটি আর তার দেশে পাঠানো সম্ভব হবে না বলে জানায় পুলিশ।
পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের সেই বিষয়টি জানানোর পর বাবা-ছেলে ওই দুই জেলে জানিয়েছেন তাদের মাছ ধরার সেই নৌকাটি বাংলাদেশী জেলে জিয়াউরকে উপহার দিয়ে যেতে চান।
ওসি বলেন, “ওরা (শ্রীলঙ্কান দু’জন জেলে) আমাকে বলছে যে আমাদের উদ্ধার করেছে, তাকে আমাদের নৌকাটি গিফট করে দিবো। তবে, আমরা এই নৌকাটি আপাতত জব্দ তালিকায় যুক্ত করে আদালতে উপস্থাপন করেছি।”
তিনি জানান, ওই নৌকাটি এখন যদি বাংলাদেশী জেলে তাদের কাছ থেকে গিফট হিসেবে নিতে চান, তাহলে সেটি আদালতের মাধ্যমে সব প্রক্রিয়া শেষ করে নিতে পারেন। তবে আদালতের সব প্রক্রিয়া শেষ করেই করতে হবে।
বাংলাদেশী জেলে জিয়াউর অবশ্য সেই আগ্রহও দেখিয়েছেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘তাদের জন্য নিঃস্বার্থ উপকার করেছি। তারা যদি ভালোবেসে নৌকাটি দিতে চান আমি সেটি নেবো।’
সূত্র : বিবিসি



