ঈদুল ফিতরের দিন কিশোরগঞ্জের আকাশ সকাল থেকেই ছিল কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে তাপমাত্রা বাড়ে। তবে আগের কয়েকদিনের মতো তাপমাত্রা বেশি ছিল না। সুর্য ছড়িয়ে দেয় নরম আলো। এরকম রোদ ঝকমকে নরম আবহাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহে সোমবার সকাল ১০টায় ঈদের জামাত শুরু হয়। এবার ছিল ওই ঈদগাহে ১৯৮তম ঈদ জামাত। জামাতে এবার স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি মুসল্লি অংশ নেন।

ঈদ জামাতে খুৎবা দিচ্ছেন মুফতি মাওলানা আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ : নয়া দিগন্ত
গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিতর্কিত মাওলানা শাহবাগী ফরীদ উদদীন মাসউদকে ইমাম নিয়োগ দেয়ায় এই ঈদগাহ ঐতিহ্য হারাতে বসেছিল। দিন দিন মুসল্লির সংখ্যা কমতে শুরু করেছিল।
আওয়ামী সরকারের পতন হওয়ায় দীর্ঘ ১৫ বছর পর মুসল্লিদের পছন্দের ও ঈদগাহের বৈধ ইমাম মুফতি মাওলানা আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহকে পুনর্বহাল করা হয়। এ কারণে এবার মানুষের আগ্রহ ছিল এই মাঠের দিকে বেশি। কিশোরগঞ্জ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মুসল্লিরা এসে ঈদ জামাতে অংশ নেন।
ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক ফৌজিয়া খান সরকারি বিভিন্ন সংস্থার বরাত দিয়ে ধারণা দেন, এবার শোলাকিয়া ঈদগাহে ঈদুল ফিতরের জামাতে ছয় লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই ঈদ জামাতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিরা দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মার শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য দোয়া করেন। জুলাই অভুত্থানে আহত ও শহীদদের স্মরণেও দোয়া করা হয়।
বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভোর থেকেই মুসল্লীরা এই মাঠের দিকে আসতে থাকে। এক পর্যায়ে মুসল্লিদের ঢল নামে শোলাকিয়া ঈদগাহে।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে দূর-দূরান্ত থেকে আসা টুপি পাঞ্জাবি পরা পায়ে হাঁটা মুসল্লিদের ভিড় ঈদগাহে এসে পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
সুশৃংখল ভাবে মুসল্লিরা মাঠে এসে প্রবেশ করেন।
তবে মাঠে জায়নামাজ ও মোবাইল ছাড়া কোনরকম ব্যাগ ও ডিভাইস নিয়ে আসা নিষিদ্ধ ছিল।
নিরাপত্তা তল্লাশীর মধ্য দিয়ে মাঠে প্রবেশ করতে হয়েছে মুসল্লিদের। মাঠ ও এর আশপাশে ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা।
সিসি ক্যামেরায় মনিটর করা হয় মাঠের ভেতর ও চারপাশ। মাঠের চারপাশে ছিল ৬টি ওয়াচ টাওয়ার। চারটি শক্তিশালী ড্রোন ক্যামেরা মনিটর করে মাঠ ও এর আশপাশ এলাকা।
সকাল আটটার দিকেই মুসল্লিতে ভরপুর হয়ে যায় মূল মাঠ।
জামাত শুরুর এলান দেয়ার সাথে সাথে মাঠ ছাড়িয়ে আশেপাশের রাস্তা, ফাঁকা জায়গা, বাড়ি, বাড়ির ছাদে মুসল্লিরা নামাজের প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। সকাল ১০টা বাজতেই ঐতিহাসিক এই মাঠের ইমাম এলান দেন, শোলাকিয়ার ১৯৮তম ঈদুল ফিতরের জামাত শুরু হতে যাচ্ছে। ঐতিহ্য ও রেওয়াজ অনুযায়ী জামাত শুরুর পাঁচ মিনিট, তিন মিনিট ও এক মিনিট আগে তিনটি, দুইটি ও একটি বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়।
শুরু হয় ঐতিহাসিক শোলাকিয়ায় উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত। ঝকমকে রোদের মধ্যে মুসল্লিরা তাকবিরে তাহরিমা পড়ে জামাতে অংশ নেন। জামাতে ইমামতি করেন ঈদগাহ কমিটির ও মুতাওয়াল্লীর নিযুক্ত ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ।
জামাতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজাবে রহমত, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাহিদ হাসান খান, জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মোঃ রমজান আলী, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলামসহ বিশিষ্টজনেরা অংশ নেন।
নামাজ শেষে মুসল্লিদের জন্য দিক নির্দেশনামুলক খুতবা দেন ইমাম আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছইফুল্লাহ। এরপর কাঙ্ক্ষিত মোনাজাত। ইমামের সাথে মাঠের লাখো মানুষ অংশ নেন মোনাজাতে। দেশের সুখ, সমৃদ্ধি, পাপ থেকে মুক্তি এবং পরম করুাণাময়ের অপার সন্তুষ্টি অর্জনে দু'হাত তুলে কান্নায় ভেঙে পড়েন মুসল্লিরা।
শোলাকিয়ার ঈদ জামাতে অংশ নিতে শত শত কিলোমিটার পার হয়েও এসেছিলেন মুসল্লিরা। চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে মোজাম্বিক প্রবাসী
মফিজুর রহমান চৌধুরী (৫০) দুই দিন আগেই চলে আসেন ঈদ মাঠে। তিনি বলেন, 'ছোট সময় থেকেই এই ঈদগাহের সুনাম শুনে আসছি। ইচ্ছা ছিল এই মাঠে একদিন নামাজ পড়বো। লাখো মানুষের সাথে জামাত পড়েছি। আল্লাহ আমার ইচ্ছা পূরণ করেছেন। আল্লাহর কাছে অনেক শুকরিয়া।'
কক্সবাজারের রোমালিয়াছড়া থেকে আমিনুল ইসলাম (৪৫) এসেছিলেন তার বিয়াই রফিকুল ইসলামকে সাথে নিয়ে। আমিনুল বলেন, ' আগে টিভির খবরের শুনতাম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত হয় শোলাকিয়ায়। এবার সশরীরে এসে জামাতে অংশ নিলাম । ভিতরে এক ধরনের প্রশান্তি কাজ করছে আমার। এক বছর ধরেই পরিকল্পনা ছিল এই ঈদে জামাতে অংশ নেব। আল্লাহ আমাকে কবুল করেছেন।'
কুমিল্লা জেলার মীর হোসেন (৬৫) চার বছর ধরে এই ঈদগাহে এসে ঈদের নামাজ পড়েন। এবার কিছুটা অসুস্থ। তারপরেও এসেছেন। মীর হোসেন বলছিলেন, ' এই ঈদগাহে ঈদের জামাত পড়ে যে শান্তি পাই, আর কোথাও পাই না। নিয়ত করেছি যতদিন আল্লাহ শক্তিসামর্ত রাখেন এই ঈদগাহেই এসে ঈদের জামাত পড়ব।
মাঠে নামাজ পড়তে আসা কিশোরগঞ্জ সদরের খালিদ হাসান জুম্মন (৩৮) বলেন, 'গত পনের বছর এই ঈদগাহে এসে নামাজ পড়তেও ভয় হতো। এবার মুক্তস্বাধীনভাবে জামাতে নামাজ পড়তে পেরেছি। এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব হচ্ছে। '
সাংবাদিক শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ বলেন, এলাকায় এই ঈদগাহকে 'ঈদগানা' বলা হয়।কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্ব দিকে শোলাকিয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীর ঘেঁষে এই ঈদগাহের অবস্থান। প্রায় সাড়ে ৬ একর আয়তনের ঈদগাহে মাঠের ভেতরে স্বাভাবিক অবস্থায় ১ লাখ ৬৫ হাজার মুসল্লির ধারণক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এখানে প্রতি বছর ঈদের নামাজে অংশ নেন লাখ লাখ মুসল্লি।'
সরেজমিনে দেখা গেছে এবার মাঠের ভেতরেই অন্তত আড়াই লাখ মুসল্লি ঠাসাঠাসি করে নামাজ আদায় করেন। আর মাঠের বাইরে রাস্তা-ঘাট ও পেছনে অংশ নেন আরো দুই থেকে আড়াই লাখের মতো মানুষ।
বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম বীর ঈশাখাঁর ১৬তম বংশধর দেওয়ান মান্নান দাঁদ খান ১৮৫০ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহের জন্য জমি ওয়াক্ফ করেন। তারও দু'শো বছর আগে থেকে শোলাকিয়া মাঠে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে ওই ওয়াকফ দলিলে উল্লেখ আছে। লাখো মুসল্লির সাথে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ পড়লে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়- এমন ধারণা থেকে প্রতি বছর এখানে দেশ-বিদেশের কয়েক লাখ মুসল্লির ঢল নামে। বংশ পরম্পরায় এ মাঠে নামাজ পড়ে আসছেন অনেকেই। ১৮২৮ সালে শোলাকিয়া মাঠে 'সোয়া লাখ' মুসল্লি একসাথে ঈদের নামাজ আদায় করেছিলেন। সেই থেকে এ মাঠের নাম হয় 'সোয়া লাখিয়া'। যা এখন উচ্চারণ বিবর্তনে 'শোলাকিয়া' নামে পরিচিত।
শোলাকিয়া মাঠ নিয়ে আরেকটি জনশ্রুতির বর্ণনা হলো, মুঘল আমলে এখানকার পরগনার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল শ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক কোটি টাকা। কালের বিবর্তনে শ লাইখ্খা থেকে বর্তমান শোলাকিয়া হয়েছে।



