জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) একজনের, অথচ সেই পরিচয় ব্যবহার করে পাসপোর্ট ইস্যু হয়েছে অন্য একজনের নামে। অভিযোগটি সত্য হলে এটি কেবল একজন নাগরিকের পরিচয় চুরির ঘটনা নয়; বরং দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট যাচাই ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার ভাটি সাভার গ্রামের বাসিন্দা মো: তোফায়েল আহমেদ (২৪) অভিযোগ করেছেন, তার নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ৭৩৬৩৩৫২২৭৪ এবং বাবা-মা’র পরিচয় ব্যবহার করে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি পাসপোর্ট তৈরি ও গ্রহণ করেছেন। নিজের অজান্তে এমন একটি পাসপোর্ট ইস্যুর তথ্য জানতে পেরে তিনি বিস্মিত, আতঙ্কিত এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
গত ২৬ জুলাই ২০২৬ ময়মনসিংহ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে নতুন ই-পাসপোর্টের আবেদন করতে গিয়ে বায়োমেট্রিক তথ্য দেয়ার সময় কর্মকর্তারা তাকে জানান, তার নামে ইতোমধ্যেই একটি পাসপোর্ট ইস্যু রয়েছে। ফলে সাথে সাথেই তার নতুন পাসপোর্টের আবেদন প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়।
এরপর তিনি ময়মনসিংহ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। একই সাথে ভবিষ্যতে তার পরিচয় ব্যবহার করে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কায় কোতোয়ালী মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার উদ্যোগ নেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পাসপোর্টটি ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর পশ্চিম ঢাকার একটি পাসপোর্ট অফিস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু সেখানেই উঠে এসেছে আরো বিস্ময়কর তথ্য। পাসপোর্টে নাম রয়েছে ‘তোফায়েল আহমেদ’, অথচ গ্রহণকারীর স্বাক্ষরে লেখা হয়েছে ‘টুপায়েল’। একই ব্যক্তির পরিচয়ে ভিন্ন নামে স্বাক্ষর থাকা সত্ত্বেও কীভাবে পাসপোর্ট হস্তান্তর করা হলো—এ প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—প্রকৃত তোফায়েল আহমেদ যদি কখনো পাসপোর্টের আবেদনই না করে থাকেন, তাহলে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে কীভাবে পাসপোর্ট ইস্যু হলো? বায়োমেট্রিক যাচাইয়ে কোথায় ব্যর্থতা ছিল? আবেদনকারী কে? পাসপোর্ট গ্রহণের সময় পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছিল কি? নাকি সরকারি তথ্য ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ কোনো জালিয়াত চক্র পরিচয় চুরির ভয়ংকর ফাঁদ গড়ে তুলেছে?
ভুক্তভোগী মো: তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, নাম এবং বাবা-মায়ের পরিচয় ব্যবহার করে অন্য একজন পাসপোর্ট তৈরি করেছে। বিষয়টি জানার পর আমি হতবাক। আমি চাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন হোক এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হোক।’
পরিচয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি অত্যন্ত ভয়াবহ। কারণ একটি পাসপোর্ট শুধু বিদেশ ভ্রমণের নথি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি। অন্যের পরিচয়ে পাসপোর্ট তৈরি হলে তা মানবপাচার, অর্থপাচার, আন্তর্জাতিক অপরাধ কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অপব্যবহারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালকের কার্যালয়ের ইনচার্জ মো: শামীম আহমেদ বলেন, ‘আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, তা তদন্তের জন্য প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন ও চিঠি পাঠানো হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।’
ঘটনাটি এখন শুধু একজন ভুক্তভোগীর অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই। এটি জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট ব্যবস্থার নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা এবং সরকারি যাচাই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। যদি একটি এনআইডি ব্যবহার করে অন্য কেউ পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে একই কৌশলে আর কত নাগরিকের পরিচয় অপব্যবহার হয়েছে—সেই প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।
ভুক্তভোগীর দাবি, শুধু তার অভিযোগ নিষ্পত্তি করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। এই ঘটনার সাথে কোনো কর্মকর্তা, দালালচক্র বা সঙ্ঘবদ্ধ জালিয়াত নেটওয়ার্ক জড়িত কি না, তা খুঁজে বের করে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সাথে দেশের পাসপোর্ট ও পরিচয় যাচাই ব্যবস্থার দুর্বলতা থাকলে তা দ্রুত সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় যেকোনো নাগরিকের পরিচয় যেকোনো সময় অন্যের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।



