সিলেটের গণজমায়েতে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে বিজয়ী করে ফ্যাসিবাদ কাঠামো ভেঙে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম। এসময় দেশের ৫ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি, জিএস ও এজিএসরা উপস্থিত ছিলেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বিকেল ৪টার দিকে সিলেট নগরীর চৌহাট্টা পয়েন্টে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র সংসদের আয়োজনে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে বিশাল গণজমায়েতে তিনি এ আহ্বান।
হাজার হাজার নগরবাসীর উপস্থিতিতে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত সমাবেশে সাদিক কায়েম বলেন, বাংলাদেশ গঠনে শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার অনেক অবদান রয়েছে। আজকের বিএনপি শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার আদর্শ ধারণ করে না। এই বিএনপি জুলাইও ধারণ করে না। তারেক রহমান নাটক করছেন বিভিন্ন মঞ্চে। তিনি কোথাও ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে কথা বলেন না। যদি জুলাইকে ধারণ না করেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জনগণ জবাব দেবে।
তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে ডাকসু ভিপি বলেন, আপনি কী হাসিনা হতে চান, সেটা ক্লিয়ার করেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনা হতে চাইলে আমরা আপনাকে ভারতে পাঠিয়ে দেবো, যেভাবে হাসিনাকে ভারতে পাঠিয়েছে ছাত্র-জনতা।
দুর্বৃত্তায়ন ও খুনের রাজনীতির কারণে বিএনপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে হুঁশিয়ারি দিয়ে আবু সাদিক কায়েম বলেন, তারেক রহমান আপনি বলেছিলেন, আই হ্যাভ এ প্ল্যান। আপনার সেই প্ল্যান কী মানুষ খুন করার প্ল্যান?
শেরপুরে বিএনপির সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করেছে আমার ভাই রেজাউলকে। এখন পর্যন্ত খুনিদের গ্রেফতার করে নাই সরকার। ইসি হাতে চুড়ি পরে বসে আসে। এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি ইসি। ইসির কাজ হচ্ছে, নিরপেক্ষ নির্বাচন করা। শেরপুরে গতকাল সেনাবাহিনীর উপর হামলা হয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত সেনাপ্রধান কোনো ব্যবস্থা নেননি।আপনারা নিরপেক্ষ আচরণ করুন, নতুন দেশের জনগণ আপনাদের ক্ষমা করবে না।
দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির সন্ত্রাসীরা মা বোনদের ওপর হামলা করছে জানিয়ে ডাকসু ভিপি বলেন, তারেক রহমানকে বলবো, আপনার গুন্ডাদের সামলান। আর যদি কোনো মা বোনের উপর হাত তুলেন, সেই হাত ভেঙে দেবো। আর কোনো মা-বোনের উপর আর হামলা করলে লন্ডনে পালানোরও সময় পাবেন না।
বিএনপিকে বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি করার আহবান জানিয়ে ডাকসু ভিপি বলেন, গত দেড় বছরে দেড় শতাধিক মানুষকে খুন করা হয়েছে। এগুলো বন্ধ করুন, তাহলে আপনাদের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারেন।
ছাত্রদল ও বিএনপিকে আজকের প্রোগ্রামে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা জনগণের কাছে আসতে ভয় পায়, এজন্য আজকের অনুষ্ঠানে আসে নাই। জনগণকে ভয় পেলে রাজনীতি কিভাবে করবেন। একটি দল, ‘না’ এর পক্ষে নিয়েছে। না মানে দিল্লির গোলামি করা। না মানে বিগত তিনটি নির্বাচনে ফ্যাসিবাদ কাঠামোতে ফিরে যাওয়া। তরুণ প্রজন্ম বেঁচে থাকতে সেটা হতে দেবে না।
ডাকসু ভিপি আরো বলেন, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্ম ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। গণভোটে বিজয়ী করতে প্রত্যেককে অ্যাম্বাস্যাডর হতে হবে। হ্যাঁ মানে পরিবারতন্ত্র ভেঙে দেয়া। হ্যাঁ মানেই একজন কৃষককেও রাষ্ট্র প্রধান হওয়ার সুযোগ দেওয়া। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম কাজ হবে গণভোটে হ্যাঁ-তে সিল মারা।
গণজমায়েতে সিলেট-১ (সিটি কর্পোরেশন-সদর উপজেলা) আসনে ১০ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য মনোনীত প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, আমাদেরকে নতুন লড়াই শুরু করতে হবে। বিভিন্ন জায়গায় আমার ভাই ও বোনদের হত্যা করা হচ্ছে। ভারতের স্বার্থে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। সেটা ভেঙে চুরমার করে দেবে জনগণ। জুলাই সনদকে স্বীকৃতি দিতে হবে। জুলাই যোদ্ধাদের স্বীকৃতি দিতে হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি হ্যাঁ ভোটে রায় দিতে হবে।
ভারতপন্থীদের এদেশে নির্বাচন করার কোনো অধিকার নেই। তরুণরা জেগে থাকলে ষড়যন্ত্রকারীরা পালাবে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রাতের ভোট ও ভোট বাক্স ছিনতাই যাতে না হয়, এজন্য গণভোটের আয়োজন করেছে সরকার। ফ্যাসিবাদ যাতে ফিরে না আসে, সেজন্য ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে। এই দেশটাকে সঠিক পথে যাতে নিয়ে যাওয়া যায়, যাতে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তাই গণভোটের আয়োজন। পরিবর্তনের জন্য নতুন বাংলাদেশ গড়তে অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের জন্য জুলাই বিপ্লব হয়েছিল। জনগণ আশা করেছিল, এবার সুশাসন ও মানবিক বাংলাদেশ গঠন হবে। কিন্তু গত দেড় বছরেও সেটা নিশ্চিত হয়নি। জুলাই বিপ্লব কোনো গোষ্ঠীর জন্য হয়নি। হ্যাঁ মানেই সুশাসন, মানবিক ও ন্যায় বিচারের বাংলাদেশ। সুতরাং গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিতে হবে।
সিলেট প্রেস ক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস উন নূর বলেন, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল। সেই ২৩ বছরের শাসনামলেও সুশাসন ছিল না। বাংলাদেশ সৃষ্টির ৫৪ বছর পার হয়েছে। সেখানেও সুশাসন ছিল না। সুশাসন আমাদের কপালে খুবই কম জোটেছে। তিনি বলেন, আগামীর গণভোট সুশাসনের জন্য। আমরা চাই বাংলাদেশ সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাক। কিন্তু পুরাতন পদ্ধতিতে চললে কেয়ামত পর্যন্তও সমৃদ্ধি ও সুশাসনের পথে হাঁটবে না দেশ। তাই পরিবর্তন চাইলে গণভোটে হ্যাঁ দিতে হবে। গ্রামাঞ্চলের নাগরিকদের ‘হ্যাঁ’ ভোট নিয়ে সচেতন করতে হবে, এটা খুবই জরুরি।
জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, জুলাই বিপ্লবের পরও স্বাধীন বাংলাদেশে শহীদ ওসমান হাদিসহ বহু ভাইদের জীবন কেড়ে নেয়া হয়েছে। কিছু কুলাঙ্গার আমাদের মা বোনদের বিবস্ত্র করার হুমকি দিচ্ছে। বাংলাদেশের ছাত্র জনতা জেগে থাকলে সেটা দিতে হতে হবে না। কোনো কুলাঙ্গার মা বোনদের উপর হাত তুললে সিলেটবাসী সেই হাত ভেঙে দেবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গোলামির জিঞ্জির পরবো, নাকি মাথা উঁচু করে দাঁড়াবো। সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে জনগণকে।
তিনি বলেন, শুধু ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলেই হবে না, প্রতিটি তরুণকে ভোট গণনা না হওয়া পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে থাকতে হবে। কোনো সন্ত্রাসী দলের হাতে এ দেশ তুলে দেওয়া যাবে না।
চাকসুর জিএস সাঈদ বিন হাবিব বলেন, গত ১৬ বছরে দেখেছি কিভাবে গুম করা হয়েছে। এই সিলেটের কৃতি সন্তান ইলিয়াস আলীকেও গুম করা হয়েছে। বিচার বিভাগের মাধ্যমে কিলিং করা হয়েছে। কিভাবে চাঁদাবাজি করা হয়েছে। ৫ আগস্টের পর ভেবেছিলাম, এই অবস্থার পরিবর্তন হবে। কিন্তু একটি দল হাতবদল করে দায়িত্ব নিয়েছে। তারা কিভাবে আমার মা বোনদের উপর হামলা করছে।
তিনি বলেন, একটি দল হ্যাঁ ভোট নিয়ে ধোঁয়াশার মধ্যে। তারা বুঝে উঠতে পারছে না, কী করবে। গণভোট নিয়ে ষড়যন্ত্র করবেন না, সাবধান হয়ে যান। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ আপনাদেরকে লাল কার্ড দেখাবে।
জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অথচ সেই সমান অধিকার নিশ্চিত কি আমরা দেখতে পাচ্ছি? অতীতে মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে হ্যাঁ-তে সিল দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সেই সংবিধান মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারিনি। তাই নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ এসেছে। এজন্য হ্যাঁ ভোট দিতে হবে।
মাজহারুল ইসলাম বলেন, একটি দল গণভোট নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। তারা বলছে এই গণভোট নাকি ইসলামের বিরুদ্ধে, একটি দলের পক্ষে। দেশের মানুষ সচেতন। তাদের সেই ষড়যন্ত্র ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে সিল দিয়ে জনগণ রুখে দেবে।
রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গণমানুষের মুক্তির দিন। কিন্তু এই দিন যাতে ভোট না হয়, একটি দল হত্যায় মেতে উঠেছে। শেরপুরে আমার ভাই রেজাউলকে হত্যা করা হয়েছে। এগুলো বন্ধ করুন। নতুবা করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে।
তিনি বলেন, গণভোট নিয়ে একটি দল ষড়যন্ত্র করছে। তারা জনগণকে ভুল বুঝাচ্ছে। কিন্তু মানুষ এখন সচেতন। তাদের সেই ষড়যন্ত্রের জবাব হ্যাঁ ভোটের মাধ্যমে দেবে ইনশাআল্লাহ।
জকসুর এজিএস মাসুদ রানা বলেন, নতুন বাংলাদেশে চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজি চলবে না। যদি নতুন বাংলাদেশ চান, তাহলে ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সিল মারতে হবে।
জাকসুর এজিএস ফেরদৌস আল হাসান বলেন, বাংলার জমিনে অনেক শাসন দেখেছি। এ অঞ্চলের মুক্তির জন্য কেউ ভাবেনি। তাই আগামী নির্বাচনে সুযোগ এসেছে মানুষের মুক্তির। এজন্য গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়ে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্খা বাস্তবায়ন করবেন।
ডাকসুর পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ বলেন, নতুন বাংলাদেশে খাপ খাইয়ে রাজনীতি করতে না পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেন। পুরোনো ধারায় রাজনীতি করার অধিকার আপনাদের নেই। পুরোনো ধারার রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে চান, জনগণ চিরতরে আপনাদের প্রত্যাখান করবে।
ছাত্র জমায়েতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা: ইকবাল আহমেদ চৌধুরী, ডাকসুর সদস্য শাহিনুর রহমান, কুদরত উল্লাহ জামে মসজিদের খতিব সাঈদ নুরুজ্জামান বিন মাদানী, সিলেট মহানগর শিবিরের সভাপতি শাহীন আহমেদ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন শিশির প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করেন নকিব মহিউদ্দিন। গণজমায়েতে হাজার হাজার ছাত্র জনতা শরীক হন।
ঐক্যবদ্ধ ছাত্র সংসদ সিলেট থেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের ক্যাম্পেইন শুরু করলো। দেশের প্রতিটি বিভাগে গণজমায়েত করবে সংগঠনটি।



