রংপুরে প্রি-পেইড মিটার বাতিলের দাবিতে স্তব্ধ কর্মসূচি

‘আমাদের এই আন্দোলনেও যদি নেসকো প্রি-পেইড মিটার লাগানো বন্ধ না করে তাহলে বড় আন্দোলন ডাকব। রংপুরের লোক প্যাঁচ-ঘোচ বোঝে না। কিন্তু রংপুরের লোক একবার বেঁকে বসলে, আঙুল বাঁকা করলে সেটার পরিণাম ভালো হয় না।’

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো

Location :

Rangpur
রংপুরে প্রি-পেইড মিটার বাতিলের দাবিতে স্তব্ধ কর্মসূচি
রংপুরে প্রি-পেইড মিটার বাতিলের দাবিতে স্তব্ধ কর্মসূচি |নয়া দিগন্ত

‘আমরা রংপুরের জনগণ চাচ্ছি পূর্বে যে ডিজিটাল মিটার ছিল ওইটাই থাক। আমরা প্রিপেইড মিটার নেব না। এটা জোর করে আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমরা কেন চাপিয়ে নেব? আজকে ১,০০০ ঢুকাচ্ছি, কালকে নাই। এই পকেট কাটা মিটার আমরা নেব না। আমরা এই মিটার লাগাইতে রাজি না। তাই স্তব্ধ কর্মসূচি ডাকছি। আমাদের এই আন্দোলনেও যদি নেসকো প্রি-পেইড মিটার লাগানো বন্ধ না করে তাহলে বড় আন্দোলন ডাকব। রংপুরের লোক প্যাঁচ-ঘোচ বোঝে না। কিন্তু রংপুরের লোক একবার বেঁকে বসলে, আঙুল বাঁকা করলে সেটার পরিণাম ভালো হয় না।’

এভাবেই ক্ষোভের সাথে কথাগুলো বলছিলেন রংপুর মহানগরীর মেডিক্যাল পূর্বগেট সরদারপাড়ার বাসিন্দা ব্যবসায়ী আবু ছালেকের।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) প্রি-পেইড মিটার বাতিলের দাবিতে আধা ঘণ্টার স্তব্ধ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।

রংপুর বিদ্যুৎ গ্রাহক ফোরামের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকাল ১১ টা থেকে বেলা ১২ টা পর্যন্ত এই স্তব্ধ কর্মসূচি পালন হয়। নগরীর শাপলা চত্বরে ১১ টা ৩০ মিনিট বাজার ১০ সেকেন্ড আগে ১০ থেকে ১ গুনে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন ফোরামের আহ্বায়ক আহসানুল আরেফিন তিতু। একই সময়ে জাহাজ কোম্পানি মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেন গ্রাহকরা। সাথে সাথেই থমকে দাঁড়ায় নগরীর সব পথ। পুরো নগরী জুড়ে ভ্যান, অটো রিকশা, মোটরসাইকেল, সাইকেল, কার, মাইক্রোবাসসহ সকল যানবাহন নিয়ে যে যেখানেই ছিলেন সেখানেই দাঁড়িয়ে যান। ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে দাঁড়িয়ে যান। হেঁটে চলা মানুষও যান দাঁড়িয়ে। প্রখর রোদেও তারা আধা ঘণ্টা পুরো নগরবাসী দাঁড়িয়ে থাকেন। পুরো নগরী স্তব্ধ হয়ে যায়।

কর্মসূচিতে অংশ নেয়া নগরীর আলমনগর এলাকার শিক্ষার্থী ময়না খাতুন বলেন, ‘আমাদের জুন মাসে ১ হাজার ১৮০ টাকার বিল নেসকো জুলাই মাসে দিয়েছে ৩ হাজার ১৩০ টাকা। তাহলে আমি এই টাকা কোথায় থেকে দেবো? প্রি-পেইড মিটার ৫০০ টাকা তুললে একদিনই যায় না। এই ডাকাতি বন্ধ করতে হবে। ভুতুড়ে বিল নেয়া বন্ধ করতে হবে।’

কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী কামারপাড়া এলাকার গৃহবধূ হোসনে আরা বলেন, ‘আমরা আগের মিটার চাই, নতুন মিটার চাই না। আমাদের সমস্যা যেমন, আমাদের প্রতি মাসে ১০০০০ টাকা বিল দিলে আমাদের সারা মাস চলে যাচ্ছে। এখন মাসে ৫০০০ টাকাও যায় অনেকের, ২০০০ টাকাও যায়। ৫০০ টাকা ভরছি, এক সপ্তাহ যায় না। এক সপ্তাহে ৫০০ টাকা শেষ। আমরা এই ক্ষতি থেকে বের হতে চাচ্ছি। সরকার প্রি-পেইড মিটার বন্ধ করুক।’

কর্মসূচির সাথে সংহতি প্রকাশ করে রিকশা আধা ঘণ্টা বন্ধ রাখেন চালক মোহাম্মদ আরিফ। তিনি জানান, ‘আমরা রিকশা বন্ধ করে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। গ্রাহককে বলেছি, আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। গ্রাহকও বলেছে আমিও আন্দোলনের সাথে একমত। সমস্যা হচ্ছে যে আমার টাকা শেষ তো আমার কারেন্ট চলবে না। আপনারা কেন হাওলাত দেবেন? হাওলাত কেন দেবেন? আমার টাকা শেষ, দেবেন না। আজকে আমার অনেক দিন ধরে কারেন্ট নাই। আগে তিন-চারশ টাকা হলেই হয়ে যেত। আর এখন আটশ টাকা ভরেছি, এক মাসও যায়নি, তাতেই শেষ! আবার নাকি পাঁচশ টাকা পাবে! টাকা কি আকাশ দিয়ে আসে? আবার আগে ৪০০ হলে হতো। এখন ১২০০ লাগে। অনেক বেশি যাচ্ছে। আমরা এটা চাই না।’

ওই রিকশার আরোহী শিক্ষিকা অবন্তী আখতার জানালেন, ‘আমি প্রি-পেইড মিটার দিয়ে অনেক ঝামেলায় পড়েছি। এপাশে টাকা তুলি ওপাশে টাকা যায়। আগের তুলনায় ৩ গুণ বেশি যাচ্ছে। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে মহা মুশকিলে পড়ে গেছি। যানবাহন চলাচল বন্ধ হওয়ায় হয়তো আধা ঘণ্টা দেরি হবে, তাতেও আমার সমস্যা নাই। সরকার প্রি-পেইড মিটার বন্ধ করে দিক।’

কর্মসূচিতে অংশ নেয়া নূরপুর এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সামসুল ইসলাম জানান, ‘এক সমস্যা বিল বেশি। ২২ টাকা করি কাটে। ২২ টাকা ইউনিট আসে কোথায়? কোনো দেশে আছে? আমাদের তো ১২টা বাজাইছে, সর্বনাশ কইরা ফেললো প্রিপেইড মিটারে। আমরা প্রিপেইড মিটার চাই না। আমাদের আগের মিটার টাঙায় দেবে, আর প্রিপেইড মিটার খুলে নেবে। আমরা এইটা চাই, আমাদের দাবি। চোর-বাটপার, ফ্যাসিবাদীদের আমলে এই প্রিপেইড মিটার, এই সরকার রাখবে কেন?’

অপর অংশগ্রহণকারী সেনপাড়ার মুদি দোকানদার ছবিরুল মিয়া জানান, ‘দোকানের মধ্যে আগে বিল আসতো সারা মাসে ৯০০ থেকে ১০০০০ টাকা। এখন বর্তমানে প্রতি মাসে যাচ্ছে ২৫০০ থেকে ২৬০০ টাকা। তা এটা কি, মানে এর আগে ডিজিটাল মিটার ছিল তখন তো এত বিল আসে নাই? রক্ত চুষে খাচ্ছে এই মিটার। এইজন্য আমরা প্রি-পেইড মিটার চাই না।’

অংশ নিয়ে আমিনুল ইসলাম নামের এক ওষুধ ব্যবসায়ী জানালেন, ‘আমাদের প্রিপেইড মিটারের নানা সমস্যা। যেমন—টাকা যখন ঢোকাব, লোডশেডিং যখন হয়, তখন এই প্রিপেইড মিটারে তো কারেন্ট থাকার কথা, কিন্তু তখন তো কারেন্ট থাকে না। আমরা লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ি। তাহলে প্রি-পেইড মিটার নেবো কেন? মোবাইলে যখন প্রি-পেইড রিচার্জ করি, তখন তো মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেটার মেয়াদ থাকে। এটা আমাদের সাথে তামাশা।’

অংশগ্রহণকারী মানবাধিকারকর্মী বিদ্যুৎ মনি ইসলাম জানান, ‘প্রিপেইড মিটারের যে সমস্যাগুলো, আমরা যে দেশের মানুষ দুবেলা দুমুঠো খাবার ঠিকমতো খেতে পারি না, সেই দেশে... সেই দেশে এই যে প্রিপেইড মিটার চালু, এই যে প্রিপেইড মিটারের বন্দোবস্ত, এটা তো একেবারেই অসহনীয়, একেবারেই অযোগ্য একটা কর্মকাণ্ড। এটা জোর করে চাপায় দেওয়া হইছে। এটা রীতিমতো নির্যাতন, নির্যাতন ছাড়া আর কিচ্ছু না। আমাদের দেশকে আরও পঙ্গু, আরও অচল করে দেওয়ার একটা বন্দোবস্ত।’

স্তব্ধ কর্মসূচি চলাকালে বিদ্যুৎ গ্রাহক ফোরামের উদ্যোগে শাপলা চত্বর ও জাহাজ কোম্পানি মোড়ে সমাবেশের আয়োজন করা হয়। শাপলা চত্বরের সমাবেশে বিদ্যুৎ গ্রাহক ফোরাম রংপুর জেলার আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. দেলোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সদস্যসচিব আহসানুল আরেফিন তিতুর সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন কমিটির উপদেষ্টা মির্জা বাবর বাবুল, আবু ছালেক, যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান সোহেল, সদস্য শাহিদুল ইসলাম সুমন, প্রিপেইড মিটারের ভুক্তভোগী কেয়া বেগম, ময়না আকতার, হাসিবুর রহমান, সোলায়মান আলী প্রমুখ। অন্যদিকে জাহাজ কোম্পানি মোড়ের সমাবেশে বিদ্যুৎ গ্রাহক ফোরাম রংপুরের উপদেষ্টা আনোয়ার হোসেন বাবলুর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন বাসদ জেলা সদস্যসচিব মমিনুল ইসলাম, সিপিবি রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি সাজেদুল ইসলাম সাজু প্রমুখ।

ফোরামের উপদেষ্টা মির্জা বাবর বাবুল বলেন, ‘আমরা পর্যায়ক্রমে বৃহত্তম কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হব। আমরা হরতালসহ আরও কঠিন কর্মসূচি দেব। এটা আমাদের কোনো রাজনৈতিক দাবি নয়। এটা জনগণের দাবি। কারণ বিদ্যুৎ হলো একটা মৌলিক... এখন মৌলিক অধিকার। আজকে বিদ্যুৎ না থাকলে দেশ অচল। কলকারখানা বন্ধ। সেরকম মানুষের ঘর-সংসারও বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাই আমরা বাধ্য হয়েছি আজকে এই আন্দোলন-সংগ্রামে সকলকে নিয়ে মাঠে নামার জন্য।’

ফোরামের জেলা আহ্বায়ক অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রথম দাবি সকল প্রিপেইড মিটার খুলে নিতে হবে। দুই নম্বর কথা হলো, আমাদের আগের ডিজিটাল মিটার ফেরত দিতে হবে। যারা ডিজিটাল মিটারের জন্য আবেদন করেছে, তাদেরকে সাতদিনের মধ্যে ডিজিটাল মিটার সরবরাহ করতে হবে এবং প্রতি মাসের বিল দেখে সত্যিকারের বিল জনগণের দোরগোড়ায় সময়মতো পৌঁছাতে হবে।’

স্তব্ধ কর্মসূচি শেষে কর্মসূচি ঘোষণা করেন ফোরাম সদস্যসচিব আহসানুল আরেফিন। তিনি বলেন, ‘রংপুরবাসী স্তব্ধ রংপুর কর্মসূচি শতভাগ সফলের মাধ্যমে প্রি-পেইড মিটারকে লালকার্ড দেখিয়েছে। এই কর্মসূচি থেকে আমরা নেস্কোকে সময় দিচ্ছি আগামী মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত। ইতোমধ্যে আমরা বিদ্যুৎ গ্রাহকদের জানিয়ে দিয়েছি। গণদরখাস্ত করুন গণহারে, এখন লাগানো প্রিপেইড মিটার খুলে নিয়ে অবিলম্বে পূর্বের পোস্টপেইড মিটার পুনঃস্থাপন করতে হবে। আমরা হাজার হাজার দরখাস্তসহ আগামী ২০ সেপ্টেম্বর নেসকো অফিস ঘেরাও করব এবং সেখান থেকে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করব।’