প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব

চৌদ্দগ্রামে তুচ্ছ ঘটনায় দফায় দফায় সংঘর্ষ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট

কিশোর গ্যাংয়ের ৬০-৭০ জন সদস্য দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মাসকরা গ্রামে প্রবেশ করে। তারা অতর্কিত আক্রমণ করে মাসকরা গ্রামের ছয়টি দোকান ও অন্তত ২০টি বাড়িঘর ভাঙচুর করে।

চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) সংবাদদাতা

Location :

Chauddagram
কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব, (ডানে) আহত আইনজীবী মনির হোসেন পাটোয়ারী
কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব, (ডানে) আহত আইনজীবী মনির হোসেন পাটোয়ারী |নয়া দিগন্ত

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নারী সংক্রান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামবাসীর মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে একাধিক বাড়িঘর ও দোকানে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় আইনজীবীসহ উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

শনিবার (৪ এপ্রিল) বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত উপজেলার কনকাপৈত ইউনিয়নের মাসকরা ও পার্শ্ববর্তী বাতিসা ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন চৌদ্দগ্রাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু মাহমুদ কাওসার হোসেন।

স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত অভিযোগে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বাতিসা ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের সাদেক মিয়ার নাতিনের সাথে কনকাপৈত ইউনিয়নের মাসকরা গ্রামের মিয়াধনের পরকীয়া চলছিল। গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাতে মিয়াধন কৃষি জমি দেখা শেষে ওই বাড়িতে গেলে খবর পেয়ে সোনাপুর গ্রামের উঠতি বয়সের কয়েকজন ছেলে বাড়িটি ঘেরাও করে মিয়াধনকে আটক করে মারধর করে।

মিয়াধনকে মারধরের খবর শুনে মাসকরা থেকে কিছু লোক ওই বাড়িতে ডাকাত প্রবেশ করেছে বলে চিৎকার করে। এতে স্থানীয়রা লাঠিসোঠা নিয়ে এগিয়ে এসে সোনাপুরের ছেলেদের ওপর আক্রমণ করে। এতে সোনাপুর গ্রামের যুবদল নেতা জাহিদুল হাসান মাসুম গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার শেষে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। তার অবস্থার অবনতি ঘটলে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এর জের ধরে আহত জাহিদুল হাসান মাসুমের বন্ধু ডলবা গ্রামের মোহাম্মদ রুবেল, তার ভাই মো: রানা ও ছাতিয়ানী গ্রামের ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে সোনাপুর, ডলবা, বসকরা, ছাতিয়ানী, শ্রীপুরসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কিশোর গ্যাংয়ের ৬০-৭০ জন সদস্য দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মাসকরা গ্রামে প্রবেশ করে। তাদের সাথে সোনাপুর গ্রামের একটি গ্রুপও একত্রিত হয়। একপর্যায়ে তারা অতর্কিত আক্রমণ করে মাসকরা গ্রামের ছয়টি দোকান ও অন্তত ২০টি বাড়িঘর ভাঙচুর করে।

এ সময় তারা বেশ কয়েকটি খড়ের গাদায় অগ্নিসংযোগ করে। লুটপাট করা হয় হাঁস, মোরগ, গ্যাস সিলিন্ডার, দোকানের মালামাসহ ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র। তাদের হামলায় কুমিল্লা বারের আইনজীবী মনির হোসেন পাটোয়ারীসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।

হামলাকারীরা মুখোশ পরিহিত ও ককটেল বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পরে সন্ধ্যায় মাসকরার বেশকিছু লোক একত্রিত হয়ে সোনাপুর গ্রামের ছাদেক মিয়ার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এতে করে তাদের চারটি বসতঘর ও ঘরের মালামাল সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। বিকেল থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষটি রাত পর্যন্ত চলে।

খবর পেয়ে চৌদ্দগ্রাম থেকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ করে। সংঘর্ষে ছাদেক মিয়ার পরিবারের চারটি ঘর পুড়ে যাওয়ায় বর্তমানে তারা খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে স্থানীয়রা জানায়।

জানা গেছে, হামলায় নেতৃত্ব দেয়া সহোদর ভাই রুবেল ও রানা চৌদ্দগ্রামের কিশোর গ্যাং লিডার। রুবেল ছাত্রলীগের পদধারী নেতা। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে নাশকতার অভিযোগে গ্রেফতার হয়। অপর ভাই স্থানীয় যুবদলের রাজনীতির সাথে জড়িত। তার বিরুদ্ধে ভাঙচুর, লুটপাট, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে চৌদ্দগ্রাম থানায়। এছাড়াও সহোদর দুই ভাই আইনজীবীর চেম্বার ভাঙচুরের ঘটনায় দায়েরকৃত দ্রুত বিচারের মামলারও আসামি।

চৌদ্দগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ মেহেদী হাসান বলেন, খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছি। এর আগেই আগুনে ঘর ও খড়ের গাদা পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

চৌদ্দগ্রাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু মাহমুদ কাওসার হোসেন বলেন, ‘সোনাপুর ও মাসকরায় দফায় দফায় সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে করে কিছু বাড়িঘর পুড়ে যায়। ভাঙচুর করা হয় একাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়ি। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনি।’