ঐতিহাসিক কাঞ্জির হাঁড়িতে মিলেছে বৌদ্ধ স্থাপত্যের নিদর্শন

স্থাপত্যের ধরন, ইটের আকার-আকৃতি এবং খননে পাওয়া প্রত্নবস্তুর বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে এটি কোনো সাধারণ আবাসিক স্থাপনা নয়, বরং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

মো: ইয়ামিন সরকার, নবাবগঞ্জ (দিনাজপুর)

Location :

Dinajpur
বৌদ্ধ স্থাপত্যের নিদর্শন
বৌদ্ধ স্থাপত্যের নিদর্শন |নয়া দিগন্ত

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে ঐতিহাসিক কাঞ্জির হাঁড়ি প্রত্নস্থলে চলমান খননকাজে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সন্ধান মিলেছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত খনন কার্যক্রমে প্রাচীন স্থাপত্য কাঠামো, দেয়াল এবং ধর্মীয় ব্যবহারের বিভিন্ন আলামত পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি বহু পুরোনো কোনো বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ, যার ওপর পরবর্তী সময়ে হিন্দু যুগের কোনো ধর্মীয় স্থাপনা নির্মিত হয়েছিল।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানায়, নবাবগঞ্জ উপজেলার ৮ নম্বর মাহমুদপুর ইউনিয়নের চকজুনিদ এলাকায় অবস্থিত স্থাপত্যের ধরন, ইটের আকার-আকৃতি এবং খননে পাওয়া প্রত্নবস্তুর বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে এটি কোনো সাধারণ আবাসিক স্থাপনা নয়, বরং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের সহকারী পরিচালক গোলাম ফেরদৌস বলেন, ‘স্থাপত্য কাঠামোর ধরন এবং খননে পাওয়া বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করে আমরা ধারণা করছি, এটি কোনো প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ হতে পারে। পরবর্তী সময়ে স্থাপনাটি পুনর্ব্যবহার করে সেখানে হিন্দু যুগের কোনো ধর্মীয় স্থাপনা বা মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনো স্তূপ বা সরাসরি বৌদ্ধ ধর্মীয় নিদর্শন পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে নিশ্চিতভাবে বৌদ্ধ বিহার বলা যাচ্ছে না। তবে স্থাপত্যের ধরণ ও অন্যান্য আলামত এ ধারণাকে আরো শক্তিশালী করছে।’

গোলাম ফেরদৌস জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলের পাহাড়পুর, সীতাকোট বিহার ও অরুণধাপসহ অন্যান্য প্রত্নস্থানের সাথে কাঞ্জির হাঁড়ির স্থাপত্যগত মিল রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, এ অঞ্চলে ছোট ছোট বৌদ্ধ বিহারের অস্তিত্ব ছিল এবং কাঞ্জির হাঁড়িও তেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার কারণে স্থাপনাটির দেয়াল ডেবে যাওয়া ও তরঙ্গাকৃতির ধ্বংসচিহ্ন দেখা গেছে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের প্রাথমিক ধারণা, ১৭২৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে স্থাপনাটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে থাকতে পারে।’

এদিকে খননকাজকে ঘিরে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।

মোগরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে কাঞ্জির হাঁড়ি নিয়ে নানা গল্প শুনে আসছি। এখানে রাজবাড়ি কিংবা গুপ্তধন থাকার কথা অনেকে বলতেন। এখন খননকাজের মাধ্যমে প্রকৃত ইতিহাস বেরিয়ে আসবে বলে আমরা আশাবাদী।’

৮ নম্বর মাহমুদপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান হাছান মো: ছালাহ উদ্দিন মাছুম বলেন, ‘এই জায়গাটি আমাদের এলাকার ঐতিহ্যের অংশ। সরকারিভাবে সংরক্ষণ ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং নতুন প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।’

তবে স্থানীয়ভাবে কাঞ্জির হাঁড়িকে ঘিরে নানা কিংবদন্তি ও লোককথা প্রচলিত থাকলেও সেগুলোর পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানান গোলাম ফেরদৌস।

তিনি বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক খননের মাধ্যমে আমরা এ অঞ্চলের প্রকৃত ইতিহাস পুনর্গঠনের চেষ্টা করছি। বাকি ঢিবিগুলোতেও খনন পরিচালনা করা গেলে আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে এবং স্থাপনাটির প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।’

বর্তমানে কাঞ্জির হাঁড়ি প্রত্নস্থলে খননকাজ অব্যাহত রয়েছে। গবেষকদের আশা, এ অনুসন্ধানের মাধ্যমে দিনাজপুর তথা বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাসের নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হবে এবং দেশের প্রত্নঐতিহ্যের ভাণ্ডারে যুক্ত হবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।