১১ দিনে ৫ জাহাজ দুর্ঘটনা : চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

চট্টগ্রাম বন্দরে আবারো জাহাজ দুর্ঘটনা ঘটেছে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে আবারো দুই বিদেশী জাহাজের সংঘর্ষের ঘটনায় চট্টগ্রাম বন্দরের নোঙর এলাকা ও চ্যানেলে জাহাজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

Location :

Chattogram
১১ দিনে ৫ জাহাজ দুর্ঘটনা : চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন
১১ দিনে ৫ জাহাজ দুর্ঘটনা : চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন |নয়া দিগন্ত

বিশেষ সংবাদদাতা, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম বন্দরে আবারো জাহাজ দুর্ঘটনা ঘটেছে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে আবারো দুই বিদেশী জাহাজের সংঘর্ষের ঘটনায় চট্টগ্রাম বন্দরের নোঙর এলাকা ও চ্যানেলে জাহাজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এর আগে গত ৪ আগস্টও মাল্টার পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লাল বয়ার সাথে ধাক্কা খায় এবং নেভাল অ্যাকাডেমি সংলগ্ন চরে আটকা পড়ে। মাত্র ১১ দিনে ৫টি বিদেশী বাণিজ্যিক জাহাজ দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা করছেন মেরিটাইম সংশ্লিষ্টরা।

বন্দর সূত্র জানিয়েছে, শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে বহির্নোঙরের আলফা অ্যাঙ্করেজে প্রবল স্রোতের কারণে প্রবেশকারী বাল্ক ক্যারিয়ার লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এমভি আনাসসা (আইএমও: ৯৫ ৯০ ৯২৯, স্ল্যাগ কার্গো বহনকারী, ২১ জন ক্রু) নোঙর করে রাখা বাংলাদেশী পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার এমভি জাহাব জাহান (আইএমও: ৯২ ১৭ ৬৮২) জাহাজের সামনের অংশে ধাক্কা দেয়। তবে আনাসসা জাহাজ জাহানের সামান্য অংশ স্পর্শ করেছে বলে সূত্র জানায়।

সূত্রমতে, এতে কোনো হতাহত, পানি প্রবেশ বা পরিবেশ দূষণের ঘটনা ঘটেনি। ঘটনার পরপরই উভয় জাহাজ নিরাপদে আলাদা হয়ে নোঙর করে এবং বর্তমানে নৌ চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। দুই জাহাজের ক্রুরা নিরাপদে আছেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম।

এদিকে গত শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরের আলফা অ্যাঙ্করেজে প্রায় ৩৩ হাজার মেট্রিক টন ডিজেলবাহী এমটি সি স্পাইক নামের একটি ওয়েল ট্যাংকারের সাথে নোঙর করে থাকা এমভি সান শাইন নামের আরেকটি জাহাজের (বাল্ক ক্যারিয়ার) সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে তেলবাহী জাহাজটির ইঞ্জিনকক্ষের এক পাশে প্রায় এক বর্গমিটার ফাটল সৃষ্টি হয়ে পানি ঢুকে যায়। তবে ডিজেল রাখা কার্গো ট্যাংকগুলো অক্ষত থাকায় বড় ধরনের তেল দূষণ থেকে রক্ষা পেয়েছে বঙ্গোপসাগর।

এর আগে গত ৪ আগস্টও মাল্টার পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লাল বয়ার সাথে ধাক্কা খায় এবং নেভাল অ্যাকাডেমি সংলগ্ন চরে আটকা পড়ে। সে সময় বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায় চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল।

মেরিটাইম সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টির ব্যর্থতায় এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট কমিটি-এসএমসি অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্তরা যথাযথভাবে কাজ করছেন কিনা, পতেঙ্গা পয়েন্টে ভিটিএমআইএস স্টেশনে যথাযথ ওয়াচ কিপিং করলে তো জাহাজ ব্যবস্থাপনা কোনো কঠিন বিষয় নয়।

সূত্র বলছে, বহির্নোঙরে ৬০-৬৫টির মতো জাহাজ থাকে, প্রত্যেক জাহাজের আধা মাইল বা এক মাইলের ভেতরে অন্য কোনো জাহাজ আসতে পারবে না—এমন এমবার্গো দিয়ে ব্যবস্থাপনা করলে এ ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে না। তাছাড়াও যদি কোনো জাহাজ কাছাকাছি চলে আসে, তবে অ্যালার্ম সিস্টেম রাখলেই হয়ে যায়। চলতি মাসে সংঘটিত সবগুলো দুর্ঘটনাকেই অব্যবস্থাপনা বলছেন মেরিটাইম সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের সব ধরনের ব্যবস্থাপনা আছে, কিন্তু সে অনুযায়ী তৎপরতার অভাব রয়েছে। আইএসপিএসের আওতায় থাকা সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট কমিটি, পোর্ট সিকিউরিটি অ্যাডভাইজরি কমিটি এবং ডিজি শিপিং কমিটি সমন্বিতভাবে কাজ করলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটত না।

সূত্র বলছে, এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে নাইরোবি কনভেনশন অনুযায়ী নিরাপদ বন্দরের সূচকে আইএমওর স্পেশাল মেজারস টু এনহ্যান্স মেরিটাইম সেফটি এবং স্পেশাল মেজারস টু এনহ্যান্স মেরিটাইম সিকিউরিটি প্রশ্নের মুখে পড়বে। যদি নিরাপদ জাহাজ চলাচল এবং জাহাজের নিরাপদ অবস্থান বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএমবি (ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরো), সিঙ্গাপুরভিত্তিক রিক্যাপ, আইএসপি (ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট সিকিউরিটি) এবং ইউএস কোস্টগার্ডের কাছে এসব মেসেজ যায়, তাহলে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের ফ্রেইট বাড়তে পারে, সারচার্জ আরোপ হতে পারে। এতে দেশ বিপুল ব্যবসা হারাতে পারে বলেও সূত্র আভাস দিয়েছে। বন্দর অধ্যাদেশ ১৯০৮ এবং চট্টগ্রাম বন্দর আইন ২০২২ অনুযায়ী বন্দরের জলসীমায় পাইলটিংয়ের নিরঙ্কুশ অধিকার চবকের—উল্লেখ্য করে সূত্র বে-পাইলটিং বন্দরের নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করে।

উপর্যুপরি বিদেশী বাণিজ্যিক জাহাজের দুর্ঘটনার পেছনে ব্যবস্থাপনাগত কোনো দুর্বলতা আছে কিনা জানতে চাইলে বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম নয়া দিগন্তকে বলেন, সবগুলো ঘটনাকে একই সূত্রে যুক্ত করার কোনো যৌক্তিক কারণ আমাদের কাছে আসেনি। প্রতিটি ঘটনার পেছনে পৃথক কারণ আছে এবং তদন্ত করে দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে যাতে ভবিষ্যতে ওই ধরনের দুর্ঘটনা আর না ঘটে, আমরা সে পদক্ষেপ নেব।