মির্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে এক ও দুই টাকার ধাতব মুদ্রা অচল পয়সায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে উপজেলার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র সুবিদখালী বন্দরসহ ছয়টি ইউনিয়নের ১৭টি হাট বাজারসহ সর্বত্র এখন একই অবস্থা। কেনাকাটার ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা কেউই এই এক ও দুই টাকার ধাতব মুদ্রা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
অনেক সময় ক্রেতারা এই কয়েন নিতে অনীহা প্রকাশ করায় বিক্রেতারা কয়েনের পরিবর্তে এক বা দুই টাকা মূল্য মানের চকলেট তুলে দিচ্ছেন ক্রেতার হাতে, আর এই চকলেট নিতেও অসম্মতি জানিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে বচসার ঘটনা ঘটছে প্রায়ই।
এছাড়া স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, উপযুক্ত কোনো কারণ ছাড়াই উপজেলার সরকারি-বেসরকারি কোনো ব্যাংকে এই কয়েন জমা নিতে চায় না, ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি ও কার্যকরী পদক্ষেপের মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়েছেন উপজেলার ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ।
জানা যায়, এক ও দুই টাকার ধাতব মুদ্রার লেনদেন বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন মাঝারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কয়েন না নেয়ায় অনেক সময় পণ্য কিনে এক-দুই টাকা দোকানে ছেড়ে যেতে হয় ক্রেতাদের। বাজারে এখন অনেকে এক ও দুই টাকার বিনিময়ে কয়েনের পরিবর্তে চকলেট, শ্যাম্পু বা নানা পন্য দিয়ে দাম সমন্বয় করেন। কিন্তু সব ক্রেতার এসব পণ্যের প্রয়োজন না থাকায় অনিচ্ছাসত্বেও তারা ওই টাকার দাবি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
সুবিদখালী বাজারের মুদি ব্যবসায়ী মো: আল-আমিন ও ইউসুফ মিয়া বলেন, কারো পণ্যের দাম ৬১ টাকা হলে এক টাকার কয়েন লেনদেন না হওয়ায় ৬০ টাকা নিতে হয়। দৈনিক ক্রেতাকে এক টাকা ছাড় দিতে হলে বছরে অনেক টাকা ক্ষতি হয়, যা আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য বড় বোঝা। এমনকি ভিক্ষুকদেরকে এই এক ও দুই টাকার ধাতব মুদ্রা দিলে তারাও নিতে অনীহা প্রকাশ করে ফেলে রেখে চলে যান।
কোম্পানির বিক্রয় কর্মী উপজেলার কলাগাছিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো: আল মামুন জানান, চার-পাঁচ দিন আগে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে আসার পর তার পকেটে থাকা এক ও দুই টাকার কয়েনগুলো নিয়ে তিনি বিপাকে পড়েছেন।
তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো দোকানে এক ও দুই টাকার কয়েন দিলে দোকানদাররা নিচ্ছেন না, মনে হয় আমি অচল পয়সা দিচ্ছি। এক ও দুই টাকার কয়েন দিয়ে মির্জাগঞ্জের হাট-বাজারে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ সরকার এমন কোনো আইন করেছে কিনা আমার জানা নেই।’
পায়রাকুঞ্জ ফেরীঘাট এলাকার চা বিক্রেতা মো: বাবুল মিয়া বলেন, ‘এখানে কেউই এক ও দুই টাকার কয়েন নিতে চান না। ফলে কারো কাছ থেকে এক টাকা বেশি নিতে হচ্ছে, কারো কাছ থেকে কম। এমনকি ভিক্ষুকরাও দুই টাকার কয়েন দিলে না নিয়ে চলে যায়।’
এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংক সুবিদখালী শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার মো: গাফফার উদ্দিন কয়েন না নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘কয়েন জমা না নেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নির্দেশনা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী এক ও দুই টাকার ধাতব মুদ্রাসহ যে কোনো মুদ্রা জমা নিচ্ছি। এই উপজেলার মানুষের মধ্যে কয়েন লেনদেনে অনেক অনীহা দেখা যাচ্ছে, ক্যাশ কাউন্টার থেকে গ্রাহকদেরকে এক বা দুই টাকার কয়েন দিলে তারা তা নিতে অনীহা প্রকাশ করে এবং বাকবিতন্ডায় জড়ান। গ্রাহকরা কয়েন দিলে আমরা সেগুলো নেয় কিন্তু আমরা দিলে কোনো গ্রাহক নেন না। আমার ভল্টে অনেক কয়েন জমা হয়ে আছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘২০১৫ সালে একটি অনুষ্ঠানে এক ও দুই টাকার ধাতব মুদ্রা তুলে নেয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিলো, সেই কথাকে ধরে রেখে এখানকার মানুষের মধ্যে একটা ভ্রান্ত ধারনা বিরাজ করছে। ফলে এখানকার মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। এই ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং প্রয়োজনে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছাম্মৎ মলিহা খানম বলেন, ‘এক ও দুই টাকার ধাতব মুদ্রার লেনদেন বন্ধ থাকার কোনো নির্দেশনা সরকার তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেই। এক ও দুই টাকার ধাতব মুদ্রা লেনদেন কি কারণে বন্ধ রয়েছে তা খতিয়ে দেখবো এবং মানুষের মধ্যে লেনদেনে যে অনীহা দেখা যাচ্ছে তা দূর করতে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।



