কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ও দৌলতপুর সংবাদদাতা
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় নিহত কথিত পীর শামীম রেজার (জাহাঙ্গীর) জানাজা ও দাফন মুসলিম রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এলাকাবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি বলে জানা গেছে।
রোববার দুপুর ১টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে তার নিজ গ্রাম ফিলিপনগরে লাশ নিয়ে আসা হয়। এসময় তার ভক্তরা দরবারে দাফনের অনুরোধ করলে পরিবার থেকে তা নাকচ করে দেয়া হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের জানিয়ে দেয়া হয়, দরবারে না স্থানীয় গোরস্থানে মুসলিম রীতি অনুযায়ী জানাজা নামাজ ও গোরস্থানে দাফন সম্পন্ন হবে।
জানা যায়, শনিবার দুপুরে দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও ইসলাম ধর্ম বিকৃতির অভিযোগে কথিত পীর শামীম রেজার আস্তানায় বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালায়। এসময় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। হামলায় গুরুতর আহত হন শামীম রেজা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ঘটনায় আস্তানায় থাকা আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
রোববার সকালে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. মো. হোসেন ইমাম জানান, নিহতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। বিশেষ করে মাথা, ঘাড় ও পিঠে গভীর আঘাত ছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার পরপরই এলাকায় পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দিন রোববার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। দুপুরের পর পারিবারিক কবরস্থানে শামীম রেজার লাশ দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। একদিকে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠী, অন্যদিকে শামীমের অনুসারীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। যেকোনো সময় অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
কে এই শামীম রেজা
দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর গ্রামের মৃত জেছের আলী মাস্টারের ছেলে শামীম রেজা। লেখাপড়া শেষে তিনি ঢাকার জিনজিরা এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে কেরানীগঞ্জে এক দরবারের অনুসারী হন এবং দীর্ঘদিন সেখানে অবস্থান করেন। ওই সময় থেকেই পরিবারের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
প্রায় দুই বছর আগে নিজ গ্রামে ফিরে এসে বাড়িতে কথিত দরবার গড়ে তোলেন শামীম। এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে বিতর্কিত ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি নিজেকে কখনও আল্লাহ, কখনও নবী বা ভগবান দাবি করতেন এবং ইসলামের মৌলিক ইবাদত সম্পর্কেও বিতর্কিত বক্তব্য দিতেন।
স্থানীয়দের দাবি, তিনি অনুসারীদের বিভ্রান্ত করে বিভিন্ন অস্বাভাবিক ধর্মীয় আচারের প্রচলন করেন। দাফন অনুষ্ঠানে ঢাকঢোল বাজানো, ‘হরে শামীম’ ধ্বনি দেয়া, পা ধোয়া দুধ পান করা—এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া ২০২১ সালে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় এবং তিনি গ্রেপ্তার হন। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারো একই ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু করেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
ঘটনার দিন সকালে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে ক্ষুব্ধ জনতা তার আস্তানায় হামলা চালায়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনায় আরও অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর একাংশ এলাকাবাসী স্বস্তি প্রকাশ করলেও শামীমের অনুসারী ও স্বজনরা ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।


