চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের ফার্মপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে ঢুকে প্রধান শিক্ষিকাকে এক অভিভাবক কর্তৃক চড় মারার অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। এই ঘটনায় চুয়াডাঙ্গার শিক্ষক মহলে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা সামসউর রহমান শুভ বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন। তিনি সরাসরি প্রধান শিক্ষিকার অফিস কক্ষে ঢুকে অসৌজন্যমূলক আচরণ শুরু করেন এবং একপর্যায়ে চেয়ারে বসা প্রধান শিক্ষিকা কাবেরী করিমকে আচমকা চড়-থাপ্পড় মারেন। এ সময় অফিস কক্ষে উপস্থিত অন্য শিক্ষকরা দ্রুত এগিয়ে এসে অভিযুক্ত অভিভাবককে থামান এবং কক্ষের বাইরে নিয়ে যান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আজ সকালে বিদ্যালয়ের দৈনিক সমাবেশ (অ্যাসেম্বলি) চলাকালে সহপাঠীর সাথে কথা বলার কারণে তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে শাসন করেন প্রধান শিক্ষিকা কাবেরী করিম। শাসন করার সময় তিনি ওই শিক্ষার্থীর গালে চড় মারেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই শিক্ষার্থীর বাবা বিদ্যালয়ে এসে প্রধান শিক্ষিকার ওপর চড়াও হন।
লাঞ্ছনার শিকার প্রধান শিক্ষিকা কাবেরী করিম ক্ষোভ ও আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন, ‘শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের যেমন আদর করি, তেমনি শৃঙ্খলা ফেরাতে একটু শাসনও করতে হয়। এ কারণে আমি মেয়েটিকে আলতো করে একটা চড় মেরেছিলাম। কিন্তু একজন অভিভাবক কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সরাসরি অফিসে ঢুকে আমার গায়ে হাত তুলবেন, এটা ভাবতেও পারি না। আমি এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি এবং বিদ্যালয়ে ফিরতে আশঙ্কা বোধ করছি।’
এ বিষয়ে অভিযুক্ত অভিভাবক সামসউর রহমান শুভ ঘটনা স্বীকার করে বলেন, ‘আমার মেয়ে অসুস্থ ছিল, তাকে চড় মারায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।’
বিদ্বেষপূর্ণ ও অনভিপ্রেত এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও কেদারগঞ্জ আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোয়াইব হোসেন বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার মতো ধৃষ্টতা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এমন অনিরাপদ পরিবেশ থাকলে শিক্ষকরা কীভাবে মন খুলে পাঠদান করবেন? আমরা ভুক্তভোগী শিক্ষকের পাশে আছি এবং এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ পেয়ে বিদ্যালয়ে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। পরে জানা যায়, শিক্ষার্থীর অভিভাবকও প্রধান শিক্ষিকাকে লাঞ্ছিত করেছেন। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার অহীন্দ্র কুমার মন্ডল বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। দাফতরিকভাবে লিখিত অভিযোগ পাওয়া মাত্রই নিয়ম অনুযায়ী ওই অভিভাবকের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
এদিকে, শিক্ষাঙ্গনের ভেতরে একজন নারী শিক্ষকের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটিজেনরা বলছেন, কোনো শিক্ষকের আচরণে আপত্তি থাকলে তা প্রশাসনিকভাবে সমাধানের সুযোগ রয়েছে, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে শিক্ষকের ওপর চড়াও হওয়া সামাজিক অবক্ষয়ের চরম বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।



