রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ২৬টি এক্সরে মেশিনের মধ্যে ২৪টি এবং তিনটি সিটি স্ক্যানের দু’টি, তিনটি এমআরআই মেশিনের মধ্যে দুইটি এবং ১৩টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের মধ্যে ২০টি অচল। এই চিত্র ফুটে উঠেছে আজ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বেলাল এমপিসহ তিন এমপির পরিদর্শনে।
রোববার (১৪ জুন) বেলা ১১টার দিকে হাসপাতাল পরিদর্শনে যান তারা। এসময় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও রংপুর-৩ আসনের এমপি মাহবুবুর রহমান বেলালের সাথে ছিলেন রংপুর-৫ আসনের এমপি গোলাম রব্বানী ও রংপুর-১ আসনের এমপি রায়হান সিরাজী ও হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান।
বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে ওয়ার্ড এবং বিভিন্ন মেশিনপত্রের রুম পরিদর্শন করেন তারা। দেখা যায় মেশিনপত্র নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। ময়লার স্তুপ দিয়ে ঢাকা। দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। বিশেষ করে মেশিনপত্র নষ্ট থাকায় চিকিৎসা সেবায় মহা হয়রানি হচ্ছে রোগীদের।
পরিদর্শনকালে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ এমপিদের জানায়, অচল এক্সরে মেশিনের মধ্যে ২০টি মেরামত অযোগ্য। এছাড়াও দু’টি করে সিটি স্ক্যান ও এমআরআই এবং আটটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনও মেরামতের অযোগ্য। দু’টি আলট্রাসনোগ্রাম ও চারটি এক্সরে মেশিন মেরামত করে সচল করা যেতে পারে। এছাড়াও আইসিইউ বেড, এম্বুলেন্সসহ সব কিছুরই সংকট। এছাড়াও জনবল সংকটের কারণে দালালচক্রের সিন্ডিকেটে অতিষ্ঠ রোগি ও অভিভাবকরা। এসময় তিন এমপি পরিচালক, কর্মকর্তাসহ রোগী ও স্বজনদের সাথে কথা বলেন। চিঠি চালাচালি করেও অচল মেশিনগুলো রুম থেকে সরানো যাচ্ছে না। ফলে নতুন মেশিন স্থাপনের উদ্যোগও নেয়া যাচ্ছে না।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বেলেন এমপিরা। এসব বিষয় সমাধানে সংসদে এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে আলাপ করার কথাও জানান তারা। এসময় তারা ইন্টার্নি চিকিৎসককর্তৃক লাশ আটকিয়ে মৃতের ছেলেকে কানধরে উঠাবসা করার তীব্র সমালোচনা করেন।
পরিদর্শন শেষে রংপুর-৫ আসনের এমপি নগোলাম রব্বানী বলেন, ‘একটা বিভাগীয় শহরের এত বড় একটা হাসপাতালে যে চিত্র আমাদের কাছে ফুটে উঠেছে, এতক্ষণ যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে আমরা সবিস্তারে মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে আবার এই তিনজন দেখা করব ব্যক্তিগতভাবে। তার কাছে আমরা এই জিনিসগুলো উত্থাপন করব এবং অভিজ্ঞতা বলবো। আমি আশা করি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মনোভাব ভালো আছে। উনি এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন এবং আমরা মনে করি যে আমরা সম্মিলিতভাবে যদি এই কথাগুলো তুলে ধরি অবশ্যই এগুলোর সমাধান হবে ইনশাল্লাহ হবে।’
পরিদর্শন শেষে-১ আসনের এমপি রায়হান সিরাজী বলেন, ‘পরিদর্শন এবং তথ্য উপাথ্যে দেখা গেলো এখানে সবচেয়ে বড় অব্যবস্থাপনার কারণ হলো জনবল ঘাটতি। এখানে ব্যবহারযোগ্য অনেক ইনস্ট্রুমেন্ট রয়েছে। কিন্তু সেগুলো জনবলের ঘাটতির কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশে অর্থের অপচয়। জনগণ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা বেশ কয়েকটা স্টোর রুম ঘুরে দেখলাম। যে সমস্ত অচল ইনস্ট্রুমেন্ট রয়েছে সেগুলো আমাদের ডিরেক্টর মহোদয়। উনি বললেন যে, এইগুলো সরানোর ব্যাপারে উনারা পদক্ষেপ নিয়েছেন, নোটিশ দিয়েছেন। কিন্তু এই যন্ত্রগুলো সরানোর জন্য তিনটা মিটিং প্রয়োজন। এই মিটিংগুলো হয়েছে কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারনে এই রুমগুলো খালি করা যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে আমরা বিশেষ পদক্ষেপ নিয়ে এই রুমগুলো খালি করার ব্যাপারে আমরা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করব ইনশাআল্লাহ।’
পরিদর্শন শেষে এসময় হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও রংপুর-৩ আসনের এমপি মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, ‘এখানে জনবলের তীব্র সংকট আছে। সেকারণে স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসা সেবা ঠিকমতো দেয়া হচ্ছে না, যাচ্ছে না। এখানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব। আমরা দেখলাম যে যন্ত্রপাতি যা ছিল খুবই কম। তার অধিকাংশ যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে আছে। যেমন আমি দেখলাম যে চব্বিশটা এক্স-রে মেশিন নষ্ট। এমআরই ও সিটি স্ক্যান মেশিন আছে তিনটি করে ছয়টি। তারমধ্যে চারটি অচল। আলট্রান্সগ্রামের ১৩টির মধ্যে ১০টি অচল। এক্সরে মেশিনের মধ্যে চারটা মেরামতযোগ্য। আর বিশটা মেরামত করা যাবে না। কিন্তু ওই বিশটা যে নতুন দেবে এটার কোনো উদ্যোগ নেই। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু করা হয়নি।’
এমপি বেলাল আরো বলেন, ‘এখানে আইসিইউ মাত্র ১০টা বেড। আপনারাই বলেন এই পুরা আটটা জেলারও যদি ধরা হয় রোগী যদি এখানে আসে রংপুরসহ, এই ১০টা বেড কি? স্ট্রোক করে, হার্ট অ্যাটাক হয় মানুষ তো আইসিইউতে যাবে। তা আমরা মিনিমাম সেবা দিতে পারছি না।’
বেলাল এমপি বলেন, ‘ স্টোর রুমে অনেক যন্ত্রপাতি পড়ে আছে। সেগুলো সরানোর জন্য ওটা অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না বলে পড়ে আছে। তিন চারটা রুম পড়ে আছে। অনেক নষ্ট জিনিস। এটা বিক্রি করে দেওয়া উচিত বা বাইরে বের করে দেওয়া উচিত। ওগুলো সরানোর না পর্যন্ত নতুন মেশিন আনার উদ্যোগ নেয়া যাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক সত্য, জনবল সংকটের কারণে মূলত এখানে দালাল চক্রের আধিপত্য চলছে। দালালদের কাছে আমাদের রোগীরা অসহায়। তাই রংপুর মেডিক্যালে যে অস্বস্তির এটা দুর্ভাগ্যজনক। আমরা তৎপর এবং আমি আশ্বস্ত করছি, আমাদের দায়িত্ব জনপ্রতিনিধি হিসেবে আপনাদের স্বার্থে এই অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার প্রধান প্রতিষ্ঠান রংপুর মেডিক্যাল হাসপাতালের এই সমস্যার সমাধান করা।’
হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, ‘হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতিসহ তিনজন সম্মানিত এমপি স্যার এসেছিলেন। তারা সব কিছু দেখেছেন। আমরা প্রয়োজনীয় সমস্যা ও তথ্য উপাথ্য তাদের কাছে দিয়েছি। আশা করি এসব বিষয়ে সমাধান হবে।’



